ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি: প্রতীকী পদক্ষেপ নাকি ভবিষ্যতের বড় পরিবর্তনের বার্তা?
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং পর্তুগাল। ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি ইউরোপীয় দেশেরও খুব শিগগিরই একই পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ঘোষণাগুলো ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে এক নতুন মোড় সৃষ্টি করেছে।
তবে বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করে বলেছেন, “এই স্বীকৃতি আসলে হামাসের সন্ত্রাসবাদকে পুরস্কৃত করার সামিল।” যুক্তরাষ্ট্রও এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বলেছে, এটি শান্তি প্রক্রিয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
ফিলিস্তিন দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়ে এলেও তার কোনো নির্দিষ্ট সীমানা, রাজধানী বা পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র কাঠামো নেই। গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের কারণে বাস্তবে ফিলিস্তিন এখনো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে কার্যকর হয়নি।
তবুও, প্রতীকী অর্থে এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলছে। পশ্চিমা বিশ্বে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন ও গণমানুষের চাপও এই সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বর্তমানে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের মধ্যে প্রায় ১৪৫টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যদিও জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের সদস্যপদ এখনও ‘স্থায়ী পর্যবেক্ষক’ পর্যায়ে। এর অর্থ তারা আলোচনায় অংশ নিতে পারলেও ভোটাধিকার নেই।
চীন, রাশিয়া অনেক আগেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এবার যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশের স্বীকৃতি সেই অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা কোণঠাসা হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের ধারণা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজায় চলমান সংকট, মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র এবং পশ্চিম তীরে অব্যাহত ইসরায়েলি বসতি স্থাপন—এসবের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষোভ বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি জাতিসংঘে দেওয়া এক ভাষণে বলেন,
“দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। এখন সময় এসেছে সেই নৈতিক দায়িত্ব পালনের।”
এছাড়াও, ১৯১৭ সালের ব্যালফোর ঘোষণা অনুযায়ী, ইহুদি ও অ-ইহুদি সবার অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুক্তরাজ্য। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও বর্তমান সিদ্ধান্তের পেছনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কঠোর অবস্থানে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকেই ওয়াশিংটন দৃশ্যমানভাবে ইসরায়েলপন্থী নীতিতে ছিল। বর্তমান সরকারও তেমন অবস্থানে রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেন,
“ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই হামাসকে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়া, যা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করবে।”
তবে আন্তর্জাতিক জনমত ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের একক অবস্থান এখন ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই স্বীকৃতি প্রতীকী হলেও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি জোরালো করবে। পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রতি চাপও বাড়াবে যাতে তারা সংলাপে ফিরতে বাধ্য হয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,
“ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাধীনতা এনে দেবে না, কিন্তু এটি দীর্ঘদিনের সংকট সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ধাপ।”


