অভাবের তাড়নায় যমজ শিশু বিক্রির সিদ্ধান্ত, রাতেই ছুটে গেলেন জেলা প্রশাসক
নেত্রকোণা পৌর শহরের নাগড়া আনন্দবাজার এলাকার এক হতদরিদ্র পরিবারে দারিদ্র্যের করাল গ্রাস এতটাই চেপে বসেছে যে, মাত্র দুই মাস বয়সী যমজ শিশুদের বিক্রির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন বাবা-মা। হৃদয়বিদারক এই খবর পৌঁছাতেই রাতেই সেই পরিবারে পৌঁছে যান জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জামান।
সরকারি জায়গায় টিন ও পলিথিনে মোড়া একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন রাজন মিয়া। পেশায় কখনো রাজমিস্ত্রী, কখনো রিকশাচালক, আবার কখনো দিনমজুর। কাজ না থাকলে রোজগারও থাকে না। পরিবারে স্ত্রীসহ চার সন্তান — সবার মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়াই তার প্রতিদিনের যুদ্ধ।
বড় দুই সন্তান মাত্র ৬ ও ৪ বছর বয়সী হলেও অপুষ্টির কারণে দেখতেও মনে হয় অনেক ছোট। তাদের পরেই জন্ম নিয়েছে যমজ সন্তান—এক ছেলে, এক মেয়ে। বয়স মাত্র দুই মাস। কিন্তু মায়ের বুকের দুধ পান না, আবার কৌটার দুধ কেনার সামর্থ্যও নেই।
এই অসহায় অবস্থায় সন্তানদের কান্না সহ্য করতে না পেরে, যমজ শিশুদের বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবেন রাজন ও তার স্ত্রী।
বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) জেলা শিশু কল্যাণ বোর্ডের সভা চলাকালীন এক সমাজকর্মী বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করলে তিনি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন।
রাতেই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সমাজসেবা কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে পরিবারটির বাড়িতে ছুটে যান জেলা প্রশাসক।
পরিবারটির করুণ অবস্থা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ডিসি। তিনি বলেন:
“বাচ্চা দুটি বিক্রি করে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যে কতটা কষ্টের, তা চোখে না দেখলে বোঝা যায় না। আমরা কিছু শুকনো খাবার, কৌটার দুধ, নগদ অর্থ দিয়েছি। সেই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি—বাসস্থান মেরামতে টিন ও আয় রোজগারের জন্য একটি রিকশা দেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, ৬ বছর বয়সী বড় ছেলেটিকে নিরাপদ আশ্রয় ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি শিশু পরিবারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাবা-মা এ ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন।
রাজন মিয়া বলেন,
“কাজ না পেলে পুরো পরিবার না খেয়ে থাকে। বাচ্চাগুলো কান্না করে, খেতে চায়। তাই বিক্রির কথা মাথায় আসে। এখন ডিসি স্যার এসে অনেক কিছু দিয়েছেন, বলেছেন বিক্রি না করতে। এখন একটু সাহস পাচ্ছি।”
এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের গল্প নয় — এটি দেশের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া অনাহার, অপুষ্টি ও অমানবিক পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি। তাৎক্ষণিক সহায়তা একদিকে প্রশংসনীয় হলেও, স্থায়ী কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটবে।


