আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জয়’ কি আদৌ সম্ভব?
ইরানকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ‘জয়’। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। আদর্শিক ও কঠোর শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত ইরানের বিরুদ্ধে সহজ কোনো সামরিক বা কূটনৈতিক সমাধান নেই।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হলে তেহরান শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা কিংবা ২০২০ সালে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর যে প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল, ভবিষ্যতে তার চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বা শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আঘাত হানলেও দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে ইরান আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
স্টিমসন সেন্টারের গবেষক বারবারা স্লাভিন বলেন, “এই সংকটে প্রতিটি বিকল্পই বিপজ্জনক। ইরানি নেতৃত্ব যদি মনে করে তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে, তাহলে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে চরম প্রতিক্রিয়া দেখাতে দ্বিধা করবে না।”
চলতি বছরের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ জোরদার হলে ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত থাকবে কঠোর পদক্ষেপ নিতে।
পরবর্তী সময়ে সহিংসতায় প্রাণহানি বাড়লেও ট্রাম্প কিছুটা সংযত ভাষায় কথা বলেন। ইরানি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী নাকি সশস্ত্র হামলার জবাব দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে স্পষ্ট অসঙ্গতি ফুটে উঠেছে।
ট্রাম্প অতীতে আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি ও সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড কিংবা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার মতো পদক্ষেপকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ভেনেজুয়েলা বা অন্য কোনো দেশের মতো নয়।
কুইন্সি ইনস্টিটিউটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, “ইরানের ক্ষেত্রে দ্রুত ও সহজ কোনো সমাধান নেই। এখানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে গেলে বিপুল সামরিক শক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন।”
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ জানিয়েছেন, ইরান যদি পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করে এবং আঞ্চলিক কার্যক্রম থেকে সরে আসে, তবে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব শর্ত ইরানের কাছে কার্যত আত্মসমর্পণের দাবি।
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর বিশ্লেষক নায়সান রাফাতি বলেন, “ইরান যদি মনে করে এটি বড় ধরনের অভিযানের সূচনা, তাহলে তারা আরও বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের অভিমত, সামরিক শক্তি কিংবা কূটনৈতিক চাপ—কোনো পথেই ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নিশ্চিত ‘জয়’ নেই। বরং ভুল সিদ্ধান্ত গোটা অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।


