ভোটের উৎসবেও উপেক্ষিত তৃতীয় লিঙ্গ
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ইসবপুর গ্রামে চারদিকে নির্বাচনি পোস্টার, মাইকিং আর প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে জমে উঠেছে ভোটের আমেজ। কিন্তু এই উৎসবের রঙ ছুঁয়ে যায়নি শাহিন আখতারকে। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি হলেও আজ পর্যন্ত কোনো প্রার্থী বা সমর্থক তার কাছে ভোট চাইতে আসেনি। তবুও ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ তার আছে—কারণ ভোটের মধ্য দিয়েই নিজের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে চান তিনি।
শাহিন আখতারের মতো রংপুর বিভাগের আট জেলায় তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন মাত্র ১৩১ জন। অথচ এই বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচনে লড়ছেন ২৩৬ জন প্রার্থী। নির্বাচনের মাঠে আলোচনায় থাকলেও হিজড়া জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা যেন বরাবরের মতোই উপেক্ষিত।
দ্বারপ্রান্তে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেষ মুহূর্তে প্রার্থীরা যখন ব্যস্ত প্রচারে, তখন হিজড়া জনগোষ্ঠীর হিসাবটা ভিন্ন। তারা শুধু ভোট দিতে নয়, চায় নিরাপত্তা, স্বীকৃতি আর মৌলিক অধিকার।
চিরিরবন্দরের হিজড়া ভোটার শাহিন আখতার বলেন, “আমরা ভোটার হয়েছি, কিন্তু আমাদের কোনো মূল্য নেই। সমাজ আমাদের মানুষ হিসেবে দেখে না, সরকারও আমাদের গুরুত্ব দিতে চায় না।”
তার অভিযোগ, হিজড়া হিসেবে ভোটার হতে গেলেও নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। চিরিরবন্দর ও খানসামা উপজেলায় মাত্র দুইজন হিজড়া নিজ পরিচয়ে ভোটার হতে পেরেছেন, তাও অনেক কষ্ট করে। তিনি চান, নতুন সরকার যেন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সহজে ভোটার হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করে।
কুড়িগ্রামের তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি পাখি আক্তার এবারের নির্বাচনে নিজ পরিচয়ে ভোট দিতে পারছেন। তিনি বলেন, “ভোট দিতে পারা আমার জন্য আনন্দের। কিন্তু আমরা এখনও সমাজে অবহেলিত। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যেন আমাদের উন্নয়নে কাজ করেন—এটাই প্রত্যাশা।”
কবির হোসেন মাহি, কুড়িগ্রামের আরেক হিজড়া ভোটার, মনে করেন—লিঙ্গ বৈষম্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তিনি বলেন, “আমরা সমাজের অংশ হয়েও শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজ আর মর্যাদার ক্ষেত্রে যুগের পর যুগ বৈষম্যের শিকার। তাই নির্বাচন আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
নীলফামারীর নাহিদ ইসলাম আগেও ভোট দিয়েছেন। প্রচারণা দেখে ভালো লাগলেও তার আক্ষেপ—কেউ তাকে ভোট চাইতে আসেনি। তিনি বলেন, “আমরা মানুষ হিসেবে অবহেলিত। ভোট দিয়েছি বহুবার, কিন্তু ভোটার হিসেবে আমাদের কোনো গুরুত্ব নেই। শুধু চাই, নিরাপদে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরতে পারি।”
২০১৩ সালে সরকার হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। তৃতীয় লিঙ্গ পরিচয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র নিলে সম্পত্তির অধিকার, চাকরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা। ফলে অনেকেই জটিলতা এড়াতে নারী বা পুরুষ পরিচয়ে ভোটার হচ্ছেন।
হিজড়া অধিকারকর্মী শহীদ হোসেন শ্রাবণ বলেন, “হিজড়াদের জন্য নির্দিষ্ট আইনি ধারা নেই। ইভটিজিং বা নির্যাতনের ঘটনায় মামলা করতেও আইনি জটিলতায় পড়তে হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে আমাদের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি চাই।”
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত সদস্য মারুফা আক্তার মিতু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি বলেন, “রাষ্ট্র যদি একটু সহানুভূতি দেখায়, আমরা প্রমাণ করতে পারি—জনসেবায়ও আমরা সক্ষম।”
তবে তার আক্ষেপ, বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই।
এবারের নির্বাচনে তৃতীয় লিঙ্গ থেকে একমাত্র প্রার্থী ছিলেন আনোয়ারা ইসলাম রানী। রংপুর-৩ আসনের এই স্বতন্ত্র প্রার্থী শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে জাতীয় সংসদে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত আসনের দাবি তোলেন।
আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, “আমরা পিছিয়ে পড়া নই, পিছিয়ে রাখা। আমরা সমাজের বোঝা হতে চাই না। মূলধারায় সম্মানের সঙ্গে অংশ নিতে চাই।”
নির্বাচন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের আট জেলায় হিজড়া ভোটার ১৩১ জন হলেও প্রকৃত সংখ্যা দেড় হাজারের বেশি। অধিকাংশই ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন চালান, নেই আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা।
ভোটের উৎসবের এই সময়ে রংপুরের হিজড়া জনগোষ্ঠীর দাবি একটাই—নিরাপদ ভোটের পরিবেশ, রাজনৈতিক স্বীকৃতি এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। প্রশ্ন রয়ে যায়, নতুন সংসদ কি তাদের সেই কণ্ঠস্বর শুনবে?


