বিবিসির প্রতিবেদন

বিএনপি সরকারের অধীনে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?

বিএনপি সরকারের অধীনে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী?
নিউজ ডেস্ক
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে অভিনন্দন জানিয়ে পরিমিত কিন্তু উষ্ণ বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লি। বাংলা ভাষায় দেওয়া এক শুভেচ্ছাবার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান-কে ‘চূড়ান্ত বিজয়’-এর জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি একটি “গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক” বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন এবং দুই দেশের “বহুমাত্রিক সম্পর্ক” আরও জোরদারের আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বার্তাটি ছিল ভবিষ্যতমুখী—এবং সতর্ক।

টানাপড়েনের পটভূমি

২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতা ছাড়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কে দৃশ্যমান টানাপড়েন তৈরি হয়। তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানিবণ্টন, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা ও রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে পুরোনো ক্ষোভও সামনে আসে। ভিসা সেবা প্রায় স্থগিত, বাস–ট্রেন চলাচল বন্ধ এবং ঢাকা–দিল্লি ফ্লাইট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

দিল্লির সামনে ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ

ভারতের কাছে এখন প্রশ্ন ‘সম্পর্ক করবে কি না’ নয়; বরং ‘কীভাবে করবে’। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা উদ্বেগকে অক্ষুণ্ন রাখা এবং উত্তপ্ত রাজনৈতিক বক্তব্য প্রশমিত—এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জই নয়াদিল্লির সামনে।

লন্ডনের SOAS University of London-এর অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল মনে করেন, বিএনপি তুলনামূলক মধ্যপন্থি হলেও বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা। সম্পর্ক স্থিতিশীল করার ইচ্ছা থাকলেও তা সহজ নয়।

অতীতের ছায়া

২০০১ সালে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি–জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত শীতল হয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহী ইস্যু ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ছিল প্রধান উদ্বেগ। ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র জব্দের ঘটনা বড় ধাক্কা দেয়। বিনিয়োগ ইস্যুতেও জটিলতা তৈরি হয়।

২০১৪ সালে ভারতের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি-র সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করাও দিল্লিতে নেতিবাচক বার্তা দেয়। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার টানা শাসনামলে ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সংযোগ অবকাঠামোয় অগ্রগতি পায়।

পাকিস্তান ফ্যাক্টর

হাসিনার পতনের পর ঢাকা–ইসলামাবাদ সম্পর্কেও গতি দেখা যায়। পাকিস্তান-এর সঙ্গে ১৪ বছর পর সরাসরি ফ্লাইট চালু, উচ্চপর্যায়ের সফর ও বাণিজ্য বৃদ্ধির খবর এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের এই অধিকার রয়েছে; তবে ভারসাম্য নষ্ট হলে সন্দেহ বাড়তে পারে।

দিল্লিভিত্তিক Institute for Defence Studies and Analyses-এর স্মৃতি পট্টনায়েকের ভাষ্য, পেন্ডুলাম একদিকে অতিরিক্ত ঝুঁকেছিল; এখন অন্যদিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে যাওয়ার ঝুঁকি আছে।

কূটনৈতিক সংলাপের আভাস

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্কর সম্প্রতি ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন—যা সংলাপের ইঙ্গিত বহন করে। এক সমাবেশে তারেক রহমানের “দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়—সবার আগে বাংলাদেশ” বক্তব্য দুই প্রতিবেশীর প্রভাব থেকে নীতিগত স্বাধীনতার বার্তা দেয়।

হাসিনার নির্বাসন: স্পর্শকাতর ইস্যু

ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি বড় বাধা হয়ে আছে। ২০২৪ সালের সহিংসতার ঘটনায় দেশে তার বিরুদ্ধে রায় ঘোষিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ইস্যু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সংবেদনশীল চাপ তৈরি করে যাবে।

OP Jindal Global University-এর অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, নেতৃত্ব ও অনুশোচনার প্রশ্নে স্পষ্টতা না এলে হাসিনার উপস্থিতি সম্পর্ককে জটিল করতে পারে।

বাকযুদ্ধ ও ‘নতুন স্বাভাবিকতা’

উভয় দেশের কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য ও মিডিয়া বিতর্ক জনমনে সন্দেহ জোরদার করেছে। অবিনাশ পালিওয়ালের মতে, ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ নির্ভর করবে—ঢাকা কতটা ভারতবিরোধী আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং দিল্লি কতটা উসকানিমূলক বার্তা কমাতে পারে তার ওপর।

ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক আন্তর্নির্ভরতা

৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত, গভীর নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সাংস্কৃতিক বন্ধন—সব মিলিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি; একই সঙ্গে ভারতের বাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের অভিমত—সম্পর্কে দূরত্ব টেকসই নয়, তবে পুনর্গঠনে দরকার আস্থা ও উদ্যোগ। বড় প্রতিবেশী হিসেবে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্ন এখন দিল্লির সামনে। শেষ পর্যন্ত কথার চেয়ে কাজে—এবং পারস্পরিক সংযমে—নির্ভর করবে ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের নতুন অধ্যায়।