পাইলস কী, কেন হয়, প্রতিকারের উপায়
মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া, পায়ুপথে ব্যথা বা চুলকানি কিংবা মলদ্বারের আশপাশে ছোট গুটি বা ফোলা দেখা দিলে অনেকেই ধরে নেন, এটি পাইলসের সমস্যা। তবে পায়ুপথে রক্তপাত বা ব্যথার পেছনে সবসময় পাইলস দায়ী নয়। তাই এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে এর প্রকৃত কারণ জানা জরুরি।
পাইলস কী?
পাইলস বা হেমোরয়েড হলো মলদ্বার ও পায়ুপথের আশপাশের রক্তনালি ফুলে যাওয়ার একটি অবস্থা। মলদ্বারের ভেতরের রক্তনালি ফুলে গেলে তাকে ইন্টারনাল হেমোরয়েড এবং বাইরের অংশে হলে এক্সটারনাল হেমোরয়েড বলা হয়।
ইন্টারনাল পাইলসের অন্যতম লক্ষণ মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্তপাত। অন্যদিকে এক্সটারনাল পাইলসে ব্যথা, ফোলা ও অস্বস্তি বেশি হতে পারে। কখনো সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে তীব্র ব্যথাও দেখা দিতে পারে।
পাইলসের কারণ ও ঝুঁকি
মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া এবং দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য পাইলসের অন্যতম সাধারণ কারণ। শক্ত মল বের করতে বেশি চাপ দেওয়ার ফলে পায়ুপথের রক্তনালিতে চাপ পড়ে এ সমস্যা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া যেসব কারণে পাইলসের ঝুঁকি বাড়তে পারে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া
- দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা
- খাবারে আঁশের ঘাটতি
- পর্যাপ্ত পানি পান না করা
- দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়ায় ভোগা
- অতিরিক্ত ওজন
- দীর্ঘ সময় বসে থাকা ও শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা
- গর্ভাবস্থা
- বয়স বাড়ার সঙ্গে মলদ্বারের আশপাশের টিস্যু দুর্বল হয়ে যাওয়া
- নিয়মিত ভারী জিনিস তোলা
যেসব লক্ষণে পাইলসের সন্দেহ হয়
পাইলসের ধরন ও তীব্রতার ওপর উপসর্গের পার্থক্য হতে পারে। সাধারণত দেখা যায়—
- মলত্যাগের সময় উজ্জ্বল লাল রক্তপাত
- পায়ুপথে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া
- পায়ুপথের আশপাশে ফোলা বা গুটি
- মলত্যাগের সময় ব্যথা বা অস্বস্তি
- পায়ুপথ দিয়ে কোনো অংশ বেরিয়ে আসার অনুভূতি
- মলত্যাগের পরও পেট পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি—এমন অনুভূতি
তবে পায়ুপথ দিয়ে রক্ত পড়লেই সেটিকে পাইলস হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। মলদ্বার বা অন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার কারণেও রক্তপাত হতে পারে। তাই বারবার রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পাইলস হলে প্রাথমিকভাবে কী করবেন?
পাইলসের উপসর্গ কমাতে প্রথমেই কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া বন্ধ করা জরুরি।
খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও পূর্ণশস্যের মতো আঁশযুক্ত খাবার বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। নিয়মিত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রমও কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।
টয়লেটে অপ্রয়োজনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এবং মলত্যাগের বেগ চেপে রাখার অভ্যাস পরিহার করা উচিত।
পায়ুপথে ব্যথা বা অস্বস্তি থাকলে কুসুম গরম পানিতে কিছুক্ষণ বসে থাকা, অর্থাৎ সিটজ বাথ, সাময়িকভাবে আরাম দিতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
হালকা পাইলস অনেক সময় খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনলে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে বারবার রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, বড় গুটি বা দীর্ঘদিন ধরে উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে পায়ুপথের রক্তপাতকে দীর্ঘদিন শুধু পাইলস ভেবে ফেলে রাখা উচিত নয়। কারণ এর পেছনে মলদ্বার বা অন্ত্রের অন্য কোনো রোগও থাকতে পারে।
কীভাবে চিকিৎসা করা হয়?
পাইলসের ধরন ও উপসর্গের তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে আঁশযুক্ত খাবার, পর্যাপ্ত পানি, কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
এসব ব্যবস্থায় উপকার না হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট পরিসরের বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন। গুরুতর বা বারবার ফিরে আসা পাইলসের ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি কিংবা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই দীর্ঘদিন নিজের মতো করে ওষুধ ব্যবহার না করে উপসর্গের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
পাইলসের ঝুঁকি কমাতে যা করবেন
পাইলস সবসময় পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে—
- নিয়মিত আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- প্রতিদিন হাঁটা বা ব্যায়াম করা
- মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া
- টয়লেটে অপ্রয়োজনে বেশি সময় না বসা
- মলত্যাগের বেগ চেপে না রাখা
- দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে না থেকে মাঝে মাঝে হাঁটাচলা করা
- দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
মনে রাখা জরুরি, পাইলস সাধারণত গুরুতর সমস্যা নয় এবং এর কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। তবে পায়ুপথে রক্তপাত, তীব্র ব্যথা বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো উপসর্গ দেখা দিলে শুধু পাইলস ধরে না নিয়ে চিকিৎসকের মাধ্যমে কারণ নিশ্চিত করা উচিত।


