ত্রৈমাসিক রিটার্নে রাজস্ব ঝুঁকি, পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরতে পারে এনবিআর
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট থেকে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের পতন হয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ কমেছে। এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন পদ্ধতিকে দায়ী করছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও কর পরিশোধের বর্তমান ব্যবস্থা থেকে সরে আগের মতো মাসিক রিটার্ন পদ্ধতি চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রথম দুই মাসে কমেছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা
এনবিআরের মোট রাজস্বের প্রায় ৩৮ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে ভ্যাট আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ২২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে ভ্যাট আদায় কমেছে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা।
জুলাইয়ে ৯ হাজার ৩০২ কোটি টাকা ভ্যাট আদায় হয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসের ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকার তুলনায় ২ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা কম। আগস্টে আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। গত বছরের আগস্টে আদায়ের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা।
ত্রৈমাসিক ব্যবস্থায় বাড়ছে রাজস্ব ঝুঁকি
ব্যবসায়ীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে চলতি অর্থবছরের বাজেটে মাসিকের পরিবর্তে তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অনেকে মনে করছেন, এতে রাজস্ব আদায় ও তদারকি—দুই ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
আগের নিয়মে চালান কাটার আগেই সংশ্লিষ্ট ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হতো। পরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিন মাস সময় পাওয়ায় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রেতাদের কাছ থেকে আদায় করা ভ্যাটের অর্থ নিজেদের কাছে রেখে তা ব্যাংকে আমানত রাখা কিংবা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) মাধ্যমে মোট ভ্যাটের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ আদায় হয়। এই ইউনিটের আওতায় রয়েছে দেশের বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান। ফলে ত্রৈমাসিক রিটার্ন ব্যবস্থার প্রভাব রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। কর্মকর্তাদের মতে, তিন মাসের ভ্যাট একসঙ্গে পরিশোধ করতে গিয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, ত্রৈমাসিক রিটার্নের কারণে সার্কেল, বিভাগ ও ইউনিটভিত্তিক মাসিক রাজস্ব তদারকির সুযোগ কমে গেছে। এতে একদিকে রাজস্ব ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে মনিটরিংও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে আগের মাসিক পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
তবে এনবিআরের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথম দুই মাসের রাজস্ব আদায়ের চিত্র দেখে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। ব্যবসায়ীদের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ শেষে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে।
নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
ত্রৈমাসিক পদ্ধতি বাতিল করে আবার মাসিক রিটার্ন চালু করা হলে ব্যবসায়ীদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাঁদের মতে, বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশে নীতির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর প্রশাসক ও ব্যবসায়ী নেতা মো. ফজলুল হক বলেন, পুরোনো পদ্ধতিতে ফিরলে কোনো ব্যবসায়ী লাভবান হবেন, আবার কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তবে মূল বিষয় হলো নীতির ধারাবাহিকতা। একটি নীতি চালুর তিন মাসের মধ্যেই পরিবর্তন করা ব্যবসার জন্য ইতিবাচক বার্তা নয়।
তবে সরকারের তাৎক্ষণিক রাজস্ব প্রয়োজন হলে তিন মাসের পরিবর্তে মাসিক ভিত্তিতে ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন ভ্যাট আদায়ের প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বারবার নিয়ম পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না।
রাজস্ব ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।


