পদ্মা ব্যারাজ হলে বদলে যাবে রাজবাড়ীসহ ২৪ জেলার চিত্র

দেশজুড়ে
পদ্মা ব্যারাজ হলে বদলে যাবে রাজবাড়ীসহ ২৪ জেলার চিত্র
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পদ্মা নদী ঘিরে রাজবাড়ীসহ দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পদ্মা ব্যারাজ। নদীভাঙন, বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট ও নৌযোগাযোগের নানা সমস্যার কারণে এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই একটি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার দাবি রয়েছে। সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পদ্মা ব্যারাজ।

রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর এলাকায় সম্ভাব্য নির্মাণস্থল পরিদর্শন এবং জনসভাকে ঘিরে সম্প্রতি প্রকল্পটি আবারও আলোচনায় এসেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়ায় স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে শুধু রাজবাড়ী নয়, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের ২৪ জেলার কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, নৌযোগাযোগ, শিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

কৃষিতে আসতে পারে বড় পরিবর্তন

পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের জীবিকা কৃষিনির্ভর। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ও বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট—দুই ধরনের সমস্যাই মোকাবিলা করতে হয় কৃষকদের।

পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে সেচ সুবিধা বাড়ার পাশাপাশি অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আসতে পারে। একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ বাড়লে ধান, পাট, গম, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য অর্থকরী ফসলের উৎপাদনও বাড়তে পারে।

স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, সেচব্যবস্থার উন্নতি হলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ায় তাদের আয়ও বাড়তে পারে।

নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে সম্ভাবনা

পদ্মার ভাঙন রাজবাড়ীর মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ। নদীর গতিপথ পরিবর্তন, তীব্র স্রোত ও ভাঙনের কারণে প্রতিবছরই নদীতীরবর্তী এলাকার বসতভিটা, ফসলি জমি, বাজার ও যোগাযোগব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ে।

গোয়ালন্দ, দৌলতদিয়া, দেবগ্রামসহ পদ্মাতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে নদীর পানি প্রবাহ ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হলে নদীশাসন, তীর সংরক্ষণ ও বন্যা ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ আরও কার্যকরভাবে নেওয়া সম্ভব হতে পারে।

নৌযোগাযোগে খুলতে পারে নতুন সম্ভাবনা

পদ্মা নদী দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটসহ বিভিন্ন ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ ও যানবাহন চলাচল করে।

নদীর তীব্র স্রোত, নাব্যতা সংকট ও ভাঙনের কারণে অনেক সময় নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ব্যারাজের মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা ও নাব্যতা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে নৌযোগাযোগে স্থিতিশীলতা আসতে পারে।

এ ছাড়া পদ্মা ব্যারাজ নির্মিত হলে রাজবাড়ীর সঙ্গে পাবনার সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি হবে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের সময়ও কমে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এতে কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও আন্তঃজেলা বাণিজ্য আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

শিল্প ও কর্মসংস্থানে নতুন দ্বার

কৃষি ও যোগাযোগের উন্নয়নের পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসতে পারে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনে বিনিয়োগ বাড়লে কোল্ড স্টোরেজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ ধরনের বিনিয়োগ বাড়লে স্থানীয়ভাবে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তরুণদের জন্য ব্যবসা ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রয়োজন পরিকল্পনা

পদ্মা নদী ও এর শাখা-প্রশাখা মৎস্যসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে ব্যারাজ নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হলে মাছের চলাচল ও প্রজননে প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি। মাছের চলাচলের জন্য ফিশ পাস, মৎস্য অভয়াশ্রম সংরক্ষণ এবং জেলেদের জীবিকা সুরক্ষার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও পরিকল্পনা

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে পানি সংরক্ষণ ও সেচ সুবিধা বৃদ্ধির পাশাপাশি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় মোট ১১৩ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার দুটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কথা রয়েছে।

পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি রাজবাড়ী ও আশপাশের এলাকার বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখতে পারে।

৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রথম পর্যায়

পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য বর্ষাকালে পদ্মার পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করা। প্রথম পর্যায়ে পাংশার হাবাসপুর এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় গত ১৩ মে পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১৫ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নৌ-লক, গাইড বাঁধ ও অ্যাপ্রোচ বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর অফটেক স্ট্রাকচার নির্মাণ, গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থার ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার ড্রেজিং, হিসনা নদী ব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার ড্রেনেজ চ্যানেল পুনর্খনন এবং ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

২৪ জেলার মানুষের প্রত্যাশা

পদ্মা ব্যারাজকে ঘিরে রাজবাড়ীসহ ২৪ জেলার মানুষের প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা, নৌযোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আলোচনায় এর সুফল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৭ কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে বলেও উঠে এসেছে।

দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি স্থানীয়দের

স্থানীয় কৃষক শাহীন মন্ডল বলেন, ‘পদ্মা ব্যারাজ হলে সেচের পানির সংকট কমবে। কৃষি উৎপাদন বাড়বে, এতে আমাদের মতো কৃষকরাই বেশি উপকৃত হবে।’

আরেক কৃষক হামিদল ইসলাম বলেন, ‘সেচ সুবিধা বাড়লে উৎপাদন খরচ কমবে। আমরা চাই দ্রুত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হোক।’

স্থানীয় বাসিন্দা এমাদ আলী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ হলে কৃষির পাশাপাশি যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসবে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে মানুষের জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন আসবে।

শহিদুল ইসলাম বলেন, ব্যারাজ নির্মাণ হলে এলাকায় নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে তরুণদের জন্যও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।

দীর্ঘ আন্দোলনের পর বাস্তবায়নের অপেক্ষা

পদ্মা ব্যারাজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। তিনি পদ্মা ব্যারাজ ও দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটির সভাপতি।

গত ১১ সেপ্টেম্বর পাংশার হাবাসপুরে প্রকল্পের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শনে যান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। এ সময় রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. হারুন অর রশিদও উপস্থিত ছিলেন।

সাইট পরিদর্শন শেষে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি সাংবাদিকদের বলেন, খুব শিগগিরই—সম্ভবত আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি অথবা মার্চে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাংশার হাবাসপুরে এসে পদ্মা ব্যারাজের উদ্বোধন করবেন। এ জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।

মন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী জনগণের কাছে পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আগের পরিকল্পনার মতো নয়, নতুন চিন্তা ও নকশায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ডিজাইন ফেজের কাজ শুরু হবে।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের ভাষ্য, পদ্মা ব্যারাজ রাজবাড়ীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। এটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি, নৌযোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।

সব মিলিয়ে পদ্মা ব্যারাজ এখন শুধু একটি পানি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; রাজবাড়ীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের কাছে এটি কৃষি, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার প্রতীক। দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নিলে পদ্মা অববাহিকার ২৪ জেলার জীবন ও অর্থনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।