তেল আমদানি বন্ধের শঙ্কা অক্টোবরে, ভর্তুকি গুনবে সরকার

জাতীয়
তেল আমদানি বন্ধের শঙ্কা অক্টোবরে, ভর্তুকি গুনবে সরকার
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমূল্যের মধ্যে আর্থিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সংস্থাটির হাতে বর্তমানে যে অর্থ রয়েছে, তা দিয়ে সেপ্টেম্বরের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও অক্টোবর থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য নতুন করে অর্থের প্রয়োজন হবে।

এ পরিস্থিতিতে তেল আমদানি স্বাভাবিক রাখতে বিপিসিকে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি সচিব ও বিপিসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে তেলের দাম আপাতত বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেই বলেও জানানো হয়েছে। ভর্তুকির অর্থের পরিমাণ ও প্রয়োজনীয় হিসাব আরও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

জ্বালানি বিভাগ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী বিপিসির হাতে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে সেপ্টেম্বরের জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও এরপর আমদানি অব্যাহত রাখতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে অন্তত দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ কার্যকরী মূলধন থাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বিপিসি।

সম্প্রতি বিপিসি এ বিষয়ে সরকারকে অবহিত করে জানিয়েছে, সংস্থাটির তহবিল দ্রুত কমে যাচ্ছে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের বাজারে সে অনুযায়ী দাম সমন্বয় না হওয়ায় বিপুল লোকসান গুনতে হচ্ছে সংস্থাটিকে।

বিপিসির হিসাবে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানির এলসি নিষ্পত্তিতে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। এই অর্থ সরকারি ভর্তুকি হিসেবে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিপিসি।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি মাসে অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারে উঠলেও পরে তা কিছুটা কমে প্রায় ১০২ ডলারে নেমেছে। উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিপিসির আর্থিক চাপও বাড়ছে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। মে মাসে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪৮৫ কোটি এবং আগস্টে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কয়েকটি মাসে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে শুল্কের চাপও বেড়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে ইনভয়েস মূল্যের ওপর নির্ধারিত শুল্কের পরিমাণও বাড়ে। ফলে তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আমদানি ব্যয় ও করভার—দুটিই বাড়ছে।

বিপিসি জানিয়েছে, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিটসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়নের পাশাপাশি তেল আমদানির ব্যয় মেটাতে চলতি বছর বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে বিপিসির মূল হিসাবে ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা এবং ইআরএল-২ প্রকল্পের জন্য আলাদা হিসাবে ১ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা রয়েছে।

বিপিসির সামনে আরও কয়েকটি বড় আর্থিক দায় রয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এলপিজি প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণে ৫২৪ কোটি টাকা এবং এসপিএম প্রকল্পের ঋণের কিস্তি হিসেবে ৬৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। এ ছাড়া অন্যান্য প্রকল্পেও প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিপিসি তেলের দাম সমন্বয়, যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং ইতোমধ্যে হওয়া লোকসানের বিপরীতে সরকারি সহায়তার সুপারিশ করেছে। তবে সরকার আপাতত তেলের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকির মাধ্যমে আমদানি কার্যক্রম সচল রাখার পথে এগোচ্ছে।