রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল রাখতে চায় না বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী

জাতীয়
রোহিঙ্গাদের অনির্দিষ্টকাল রাখতে চায় না বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গাদের চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রাখতে চায় না বাংলাদেশ। মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই সংকটের স্থায়ী সমাধান চায় ঢাকা। এ জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সূত্রপাত মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। তাই মিয়ানমারের ভেতরে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের ঘরে ফিরতে পারেন।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে

তারেক রহমান বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ মানবিক কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। মিয়ানমারে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় এখনো মানুষ দেশটি থেকে পালিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, প্রতিবছর শিবিরগুলোতে হাজার হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের বাস্তুচ্যুতির সঙ্গে নতুন একটি প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করছে বাংলাদেশ। প্রায় ৬ হাজার শিক্ষাকেন্দ্রে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।

তবে দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের শিবিরে আটকে রাখা কোনো স্থায়ী সমাধান নয় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে বলে জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান

রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, সংকটের মাত্রা বাড়লেও প্রয়োজনীয় সহায়তার পরিমাণ কমছে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই চাহিদা কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামানো হয়েছে। তাঁর মতে, রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী প্রয়োজন মেটাতেও এই সহায়তা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওপর অনির্দিষ্টকাল ধরে এই মানবিক দায়িত্ব এককভাবে বহন করার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিজেদের দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে পালন করতে হবে।

রাখাইনে এখনো নিরাপদ পরিবেশ নেই

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ জানান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা সেখানে জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে রয়েছে।

মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এ কারণে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

সংকট সমাধানে পাঁচ প্রস্তাব

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচটি প্রস্তাব তুলে ধরেন তারেক রহমান।

প্রথমত, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথনকশা তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও নিয়মিত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থাগুলোকে কার্যকরভাবে সমর্থনের আহ্বান জানান তিনি।

পঞ্চমত, মাদক, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিকতার জায়গা থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হলে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতায় আটকে না থাকে। তাদের ভবিষ্যৎ ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।