এনবিএফআইয়ে তিন মাসে খেলাপি ঋণ বাড়ল ৫৬২ কোটি টাকা
ব্যাংক খাতের পর এবার ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও (এনবিএফআই) বাড়ছে খেলাপি ঋণের চাপ। চলতি বছরের জুন শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ২৫৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। মার্চ শেষে যা ছিল ২৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৬২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ১৬৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ফলে ঋণ আদায়ে ধীরগতি ও নতুন করে খেলাপি বাড়ায় চাপ আরও বেড়েছে সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
এর আগে গত ডিসেম্বর শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২৬ হাজার ২৯২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ৪০২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। মার্চ শেষে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৮ হাজার ৩৯১ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
গত বছরের ডিসেম্বরের হিসাবে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৯ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৭ দশমিক ১১ শতাংশ।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক বছর ধরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক চিত্র ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছে। কঠোর তদারকির ফলে আগে আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ এখন হিসাবের আওতায় আসছে।
এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের তারল্য ও আমানতকারীদের আস্থার সংকটের প্রভাবও পড়েছে এনবিএফআই খাতে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা ফেরত পাওয়ার অনিশ্চয়তায় কিছু আমানতকারী অর্থ তুলে নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত কমেছে। একই সময়ে ঋণ বিতরণ ও পুরোনো ঋণ আদায়—দুই ক্ষেত্রেই গতি কমেছে।
আর্থিক খাতে বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অনিয়মের প্রভাবও এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তাঁর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের হার অত্যন্ত বেশি। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা জানান।
পি কে হালদার একসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ী এস আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন আভিভা ফিন্যান্স ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। বর্তমানে আভিভা ফিন্যান্সকে বন্ধের তালিকায় রাখা হয়েছে। গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছে।
সংকটে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৭ জানুয়ারি নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন বা বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সূচকে উন্নতির জন্য তিন থেকে ছয় মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনো ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত।
বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফাইন্যান্স, আভিভা ফিন্যান্স, ফারইস্ট ফিন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স ও প্রিমিয়ার লিজিং।
এর মধ্যে পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বিআইএফসি ও এফএএস ফিন্যান্স পি কে হালদারের অনিয়মের কারণে সংকটে পড়ে। আর আভিভা ফিন্যান্স ছিল এস আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
জিএসপি ফিন্যান্স, প্রাইম ফিন্যান্স ও বিআইএফসিকে আর্থিক সূচকে উন্নতির জন্য তিন থেকে ছয় মাস সময় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলেও ব্যক্তি আমানতকারীদের মূল টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এ জন্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে এবং সরকারের পক্ষ থেকে এ অর্থ জোগানের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আরও দুজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর ঘোষণা করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধের প্রক্রিয়ায় থাকা নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক আমানত রয়েছে ১৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের অর্থ ৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। বাকি ১১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের।
সাধারণ আমানতকারীদের সবচেয়ে বেশি অর্থ আটকে আছে পিপলস লিজিংয়ে—১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। আভিভা ফিন্যান্সে ৮০৯ কোটি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে ৬৪৫ কোটি এবং প্রাইম ফিন্যান্সে ৩২৮ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর এসব হিসাব কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কয়েকটি ব্যাংক এখনো দুর্বল অবস্থায় থাকায় তার প্রভাব এনবিএফআইগুলোর ওপর পড়ছে। ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনের পর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হারও কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এনবিএফআই খাতে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত নজরদারি করছে এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ব্যাংক খাতেও খেলাপি ঋণের চাপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হারও বেশি। তথ্য অনুযায়ী, ভারতে খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক ২ শতাংশ, ভুটানে ৪ দশমিক ৫, মালদ্বীপে ৫ দশমিক ৫, নেপালে ৫ দশমিক ৬, পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৮ এবং শ্রীলঙ্কায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান—দুই খাতেই খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ও ঋণ আদায়ে ধীরগতির কারণে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার।


