নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার

জাতীয়
নিয়ন্ত্রণহীন চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার
৩ অক্টোবর ২০২৬

নিয়মিত অভিযান, তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পরও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এবং পুলিশের নথি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তার হলেও অপরাধের নেপথ্যে থাকা অস্ত্র সরবরাহকারী, শ্যুটার ও সংঘবদ্ধ চক্রের সবাইকে আইনের আওতায় আনা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত, কাঁচাবাজার, বালুমহাল, ইন্টারনেট ও ক্যাবল সংযোগ, কলকারখানা, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শপিংমলকেন্দ্রিক চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধও সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। ভুক্তভোগীদের একটি অংশ মামলা করলেও প্রাণনাশ বা হয়রানির আশঙ্কায় অনেকে পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে চান না বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

৮ মাসে ৭২৩ মামলা

সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের ৫০টি থানার চাঁদাবাজি ও দখলসংক্রান্ত মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৪৯টি থানায় ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। এসব মামলার প্রায় ৮৫ শতাংশে তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আরেকটি পুলিশি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় প্রায় ১ হাজার ২৮০ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজের তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪৮ জন অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত।

তবে মামলা ও তদন্তের পরও অনেক ঘটনায় বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে গ্রেপ্তার ও চার্জশিটের পাশাপাশি নেপথ্যের অর্থদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং অপরাধের সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি সামনে আসছে।

অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, চাঁদাবাজির সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র যুক্ত হলে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের সুযোগ বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্র প্রদর্শন বা গুলির ঘটনা ঘটলেও অস্ত্রের উৎস এবং সরবরাহ নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ঢাকায় চাঁদাবাজিতে সক্রিয় ১৪৮ অস্ত্রধারীর তালিকার তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পরও এসব অস্ত্রধারী কীভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করছে এবং তাদের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছে কারা—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ দীর্ঘ সময় ধরে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজদের তালিকা তৈরি করছে এবং তালিকা অনুযায়ী কাউকে কাউকে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। কিন্তু অপরাধ থেকে যারা সুবিধা নেয়, তাদের আলাদা করে শনাক্ত করা না গেলে শুধু মাঠপর্যায়ের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

কিশোরদের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন

অপরাধের ধরন বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাঁদাবাজির কাজে এখন বিভিন্ন বয়সী তরুণ ও কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের সদস্যরা তাদের সামনে রেখে নিজেরা আড়ালে থাকার চেষ্টা করে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন ঘটনায় এসেছে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় কিশোর বা রাজনৈতিক কর্মীদের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য তাই শুধু মাঠপর্যায়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার নয়, পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় নতুন করে আলোচনা

চাঁদাবাজি ও অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাজধানীর বাংলামোটরের একটি ঘটনায়। ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি, মারধর ও ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগে যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা ফেরদৌস আহমেদ সাইমনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ভুক্তভোগীকে মারধর এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়।

এ ঘটনার পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রাজধানীতে কয়েকটি হামলা, ভাঙচুর ও দখলের ঘটনা ঘটে। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলার ঘটনায় অন্তত নয়জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল ডিএমপি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় লুট হওয়া মালামালের দুই ট্রাক উদ্ধার করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে।

এ ছাড়া ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজ, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান ও আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়েও হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন ঘটনায় কারণ ও সংশ্লিষ্টতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে।

নজরদারি ও সমন্বয়ের প্রশ্ন

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে হামলার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং কোনো ঘটনার পর দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবিরের মতে, রাজধানীতে কয়েক দিনের ব্যবধানে একাধিক সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনা উদ্বেগের। তাঁর প্রশ্ন, বড় ধরনের জমায়েত, প্রস্তুতি ও সংঘবদ্ধতার তথ্য আগাম আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় কেন আসেনি। দখল, উচ্ছেদ ও হামলার ঘটনায় কারা জড়িত এবং কোনো পর্যায়ে দায়িত্বে ঘাটতি ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

অন্যদিকে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওসমান গনি বলেছেন, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। মামলা হয়েছে, আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একটি ঘটনার পর রাতভর অভিযান চালিয়ে পরে মোহাম্মদপুর থেকেও আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগও আলোচনায়

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হামলা, দখল বা চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির দায় বা সংশ্লিষ্টতা আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমে নানা দাবি প্রকাশিত হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের চক্রের জায়গায় নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি ও পেশাদার অপরাধীচক্রের একটি অংশ সক্রিয় হয়েছে। এসব দাবির স্বাধীন যাচাই এবং নির্দিষ্ট ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ আলাদাভাবে প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অধীন দপ্তরগুলোর সমন্বয় সভাও নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য রয়েছে।

সব মিলিয়ে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার নয়, অবৈধ অস্ত্রের উৎস শনাক্ত, অর্থের প্রবাহ অনুসরণ, নেপথ্যের সহযোগীদের চিহ্নিত করা, মামলার দ্রুত বিচার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত এসব অভিযোগের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করবে।