ফ্যামিলি কার্ডে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে পারে: বিশ্বব্যাংক

জাতীয়
ফ্যামিলি কার্ডে সাড়ে ২৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে পারে: বিশ্বব্যাংক
৬ অক্টোবর ২০২৬

একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করে নগদ সহায়তা কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করার পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করা গেলে দেশের অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ প্রতিবেদনে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে সংস্থাটি। সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিও স্থবির হয়েছে এবং বিশেষ করে নারীদের কর্মসংস্থান কমেছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

সংস্থাটির হিসাবে, বর্তমানে সবচেয়ে দরিদ্র প্রায় অর্ধেক পরিবার কোনো না কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। ফলে সরকারি সহায়তার একটি বড় অংশ প্রকৃত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

এ অবস্থায় একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একীভূত করা, বিদ্যমান নগদ সহায়তার সুবিধাভোগী নির্বাচনে আরও কার্যকর পদ্ধতি ব্যবহার এবং এর সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এতে অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংস্থাটির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী শনাক্তকরণে সরকারের ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এর মাধ্যমে তথ্যের ভিত্তিতে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে চিহ্নিত করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্ত করা সম্ভব হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকিও দরিদ্র মানুষের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। তবে প্রকৃত সুবিধাভোগী সঠিকভাবে শনাক্ত করা না গেলে সীমিত সরকারি সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন। তাই আরও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।

সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে থাকতে পারে। বিনিয়োগ কমে যাওয়া, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতিতে চাপ অব্যাহত রয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ঋণপ্রবাহ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

রাজস্ব আহরণেও দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরেছে সংস্থাটি। ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। একই সময়ে রাজস্ব ঘাটতি ২০২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে।

তবে শক্তিশালী প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধির কারণে দেশের বহির্বিশ্বমুখী খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রমের গতি বাড়ানো গেলে ২০২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক বিভাগীয় পরিচালক জ্যাঁ পেসম বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। দরিদ্রদের সুরক্ষা এবং বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান তৈরিতেও এসব সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের মতে, দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি সেই সহায়তা যেন সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।