জিরো ক্যালরি মানেই কি সুগার ফ্রি?

স্বাস্থ্য
জিরো ক্যালরি মানেই কি সুগার ফ্রি?
১ নভেম্বর ২০২৬

ওজন নিয়ন্ত্রণের কথা ভেবে অনেকেই সাধারণ চিনিযুক্ত কোমল পানীয়ের পরিবর্তে ‘ডায়েট কোক’ বা ‘কোক জিরো’ বেছে নেন। এসব পানীয়তে চিনি ও ক্যালরির পরিমাণ কম বা প্রায় শূন্য। তবে ক্যালরি কম হলেই যে পানীয়টি স্বাস্থ্যের জন্য সম্পূর্ণ উপকারী, এমন নয়। কৃত্রিম মিষ্টিকারক এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় কিছু উদ্বেগ উঠে এসেছে। তবে এসব গবেষণার সব ফলাফলকে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ওজন নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর?

কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয় সাধারণ কোমল পানীয়ের তুলনায় ক্যালরি গ্রহণ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণে এগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালের নির্দেশিকায় ওজন নিয়ন্ত্রণ বা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানোর কৌশল হিসেবে নন-সুগার সুইটনার ব্যবহারের পরামর্শ দেয়নি। সংস্থাটি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদে শরীরের চর্বি কমানোর ক্ষেত্রে এসব মিষ্টিকারকের উল্লেখযোগ্য সুফলের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সুপারিশটি শর্তসাপেক্ষ এবং প্রমাণের সামগ্রিক নিশ্চয়তা কম। <Cite refs={[“turn149431search0″,”turn149431search1″,”turn149431search5”]}/>

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয় পানের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিন্তু এ ধরনের গবেষণায় একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—সম্পর্ক পাওয়া গেলেই একটি অন্যটির কারণ, তা প্রমাণ হয় না। আগে থেকেই ওজন বা বিপাকজনিত সমস্যায় থাকা ব্যক্তিরা চিনিযুক্ত পানীয়ের বিকল্প হিসেবে ডায়েট পানীয় বেশি পান করতে পারেন। ফলে গবেষণার ফলাফলে অন্যান্য কারণও প্রভাব ফেলতে পারে।

মস্তিষ্ক ও ক্ষুধার ওপর প্রভাব

মিষ্টি স্বাদ মানুষের মস্তিষ্কের পুরস্কার ও খাদ্যগ্রহণ-সংক্রান্ত ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে। কৃত্রিম মিষ্টিকারকও মিষ্টি স্বাদ দেয়, কিন্তু এতে সাধারণ চিনির মতো ক্যালরি থাকে না। এ কারণে মিষ্টি স্বাদ ও ক্যালরি গ্রহণের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

কিছু গবেষণায় কৃত্রিম মিষ্টিকারক এবং ক্ষুধা বা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে ডায়েট কোক পান করলেই মস্তিষ্ক অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার সংকেত দেয় কিংবা মানুষ নিশ্চিতভাবে বেশি খেতে শুরু করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। পানীয়ের পাশাপাশি একজন ব্যক্তির সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া নিয়ে উদ্বেগ

মানুষের অন্ত্রে থাকা কোটি কোটি অণুজীব হজম, বিপাকক্রিয়া ও রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে। কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট কৃত্রিম মিষ্টিকারকের সঙ্গে অন্ত্রের জীবাণুর গঠন ও কার্যক্রমের পরিবর্তনের সম্পর্ক দেখা গেছে।

তবে সব ধরনের মিষ্টিকারকের প্রভাব এক নয়। কোন উপাদান কত পরিমাণে এবং কত দিন গ্রহণ করা হচ্ছে, তার ওপরও সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করতে পারে। তাই কৃত্রিম মিষ্টিকারক অন্ত্রের সব উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে দেয়—এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়।

কিডনির ক্ষেত্রেও কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় ডায়েট পানীয় গ্রহণের সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতা কমার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে নিয়মিত ডায়েট কোক পান করলেই কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমন সরাসরি কারণ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আসপার্টেম ও ক্যানসারের ঝুঁকি: ডব্লিউএইচওর অবস্থান কী?

ডায়েট কোকসহ বিভিন্ন কম ক্যালরির পানীয়তে আসপার্টেম নামের কৃত্রিম মিষ্টিকারক ব্যবহার করা হতে পারে। ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা আইএআরসি আসপার্টেমকে ‘সম্ভবত ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ বা গ্রুপ ২বি শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে। এ সিদ্ধান্তের পেছনে মানুষের ক্ষেত্রে ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কের সীমিত প্রমাণ ছিল।

তবে একই সময়ে ডব্লিউএইচও ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি জেইসিএফএ আসপার্টেমের গ্রহণযোগ্য দৈনিক মাত্রা শরীরের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ৪০ মিলিগ্রাম অপরিবর্তিত রাখে। কমিটির মূল্যায়নে নির্ধারিত সীমার মধ্যে আসপার্টেম গ্রহণে স্বাস্থ্যঝুঁকির যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, ‘সম্ভবত ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ শ্রেণিতে থাকা মানেই স্বাভাবিক মাত্রায় গ্রহণ করলে ক্যানসার হবে—এমন নয়। <Cite refs={[“turn149431search4″,”turn149431search2″,”turn149431search9”]}/>

আসপার্টেম হজমের সময় ভেঙে ফিনাইলঅ্যালানিনসহ কয়েকটি উপাদানে পরিণত হয়। তবে ঢাকার গরম আবহাওয়ায় বোতল বা ক্যানের মধ্যে এটি ভেঙে গিয়ে বিশেষভাবে বিষাক্ত হয়ে ওঠে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। ফিনাইলকিটোনুরিয়া (পিকেইউ) রোগীদের ক্ষেত্রে ফিনাইলঅ্যালানিন গ্রহণে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

দাঁতের এনামেলের ক্ষতি হতে পারে

চিনি না থাকলেও কোমল পানীয়ের অম্লীয় উপাদান দাঁতের এনামেল ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ডায়েট কোক বা কোক জিরোর মতো পানীয়ও অম্লীয় হওয়ায় ঘন ঘন পান করলে দাঁতের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই চিনিমুক্ত পানীয়কে দাঁতের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ ভাবার সুযোগ নেই।

তাহলে বিকল্প কী?

ক্যালরি কমানোর জন্য চিনিযুক্ত কোমল পানীয়ের পরিবর্তে ডায়েট পানীয় বেছে নেওয়া কিছু ক্ষেত্রে ক্যালরি গ্রহণ কমাতে পারে। তবে এগুলোকে ওজন কমানোর নিশ্চিত উপায় বা স্বাস্থ্যকর পানীয়ের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।

তৃষ্ণা মেটাতে সাধারণ পানি সবচেয়ে ভালো বিকল্প। পাশাপাশি চিনি ছাড়া চা বা অন্যান্য পানীয় বেছে নেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত কোমল পানীয় পানের অভ্যাস থাকলে ধীরে ধীরে এর পরিমাণ কমানো এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসে ভারসাম্য আনা জরুরি।

সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, ‘জিরো সুগার’ মানেই সব দিক থেকে স্বাস্থ্যকর নয়। আবার কৃত্রিম মিষ্টিকারকযুক্ত পানীয় পান করলেই শরীরের বড় ধরনের ক্ষতি হবে—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক নয়। পানীয়ের উপাদান, গ্রহণের পরিমাণ এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করেই সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।