গাজায় শিশুরা বাঁচছে ক্ষুধা আর আতঙ্কের সঙ্গে: পাঁচ মাসের সিওয়ারের জীবন মৃত্যুর লড়াই
গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের বিভীষিকা এখন শিশুদের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে। ক্ষুধা, ভয় আর মৃত্যুর দৃশ্য তাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। প্রতিদিন তারা দেখছে লাশ, আহত মানুষ আর কাফনের কাপড়ে মোড়ানো ছোট ছোট শরীর। অনেক শিশুর নাম লেখা হয় কাফনের ওপরে, আবার অনেকেই রয়ে যায় অজ্ঞাত পরিচয়ে।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে পাঁচ মাস বয়সী সিওয়ার আশৌর। বিবিসির একজন প্রতিবেদক যখন খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে সিওয়ারকে দেখতে গিয়েছিলেন, তখন মেয়েটির কান্না যেন পুরো যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরছিল। জন্মের পাঁচ মাস পরেও সিওয়ারের ওজন মাত্র ২ কেজি—যেখানে স্বাভাবিকভাবে এমন শিশুর ওজন হওয়া উচিত ছয় কেজির বেশি।
হাসপাতাল থেকে এক ক্যান গুড়ো দুধ দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পরিবারের অবস্থা এমনই করুণ যে, দুধ বা ডায়াপার জোগাড় করাও তাদের জন্য এখন অসম্ভব। মা নাজওয়া জানান, তার মেয়ে দুধ হজম করতে পারে না, কিন্তু ফর্মুলা দুধ নেই, কারণ যুদ্ধ এবং অবরোধ সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে। এক খুপরি ঘরে সিওয়ার এখন থাকছে তার মা ও নানীর সঙ্গে, যেখানে মাছি ও কীটপতঙ্গ থেকে বাঁচাতেই মায়ের প্রতিনিয়ত যুদ্ধ।
সিওয়ারের জন্ম নভেম্বরে, গোলাবারুদ আর বোমার শব্দের মাঝেই। মা নাজওয়া বলেন, “যখন যুদ্ধবিমান বা রকেটের শব্দ হয়, ও কেঁদে উঠে। ঘুম ভেঙে গিয়ে কেঁদে কেঁদে চমকে উঠে।”
চিকিৎসকেরা বলছেন, অপুষ্টি এতটাই প্রকট যে অনেক মা শিশুকে দুধ খাওয়াতে পারছেন না। খাবার ও বিশুদ্ধ পানি এখন সবচেয়ে বড় সংকট। নাজওয়া নিজেও অপুষ্টিতে ভুগছেন, ফলে মা ও শিশুর জীবনই আজ অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট দাবি করছে, গাজায় খাদ্য সংকট নেই এবং শিশু খাদ্য নিয়মিতই সরবরাহ করা হচ্ছে, তবে তারা হামাসের বিরুদ্ধে ত্রাণ চুরির অভিযোগও করেছে। কিন্তু জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসব দাবিকে ‘অবাস্তব’ ও ‘প্রতারণামূলক’ বলে নাকচ করে দিয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব এই পরিস্থিতিকে “এক চা চামচ সহায়তায় মহাসংকট মোকাবেলার চেষ্টা” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, গাজার জনগণ এখন এক নিষ্ঠুর যুদ্ধের নিষ্ঠুরতম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
ফিলিস্তিনের ২১ লাখ মানুষ এখন সীমাহীন কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। নাজওয়ার মতো হাজার হাজার মা জানেন না আগামীকাল কোথা থেকে খাবার আসবে, কিংবা তাদের সন্তানরা আর এক রাত বেঁচে থাকবে কিনা। “কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে না,” বলেন নাজওয়া। “সবাই শুধু এখন—এই মুহূর্তে—কীভাবে বাঁচবো, সেই চেষ্টা করছে।”


