মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েলের চলমান সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পারস্য উপসাগর। পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়—তবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভয়াবহভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশেও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিও বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুতর প্রভাব ফেলবে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো শীর্ষ তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ এই প্রণালি ব্যবহার করে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির বিশ্লেষক সিনা তুসি জানিয়েছেন, “ইসরায়েল যদি ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে বড় হামলা চালায়, তাহলে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে পারে। এটি তেহরানের সর্বোচ্চ মাত্রার প্রতিক্রিয়া হতে পারে।”
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস কাতার। ২০১৭ ও ২০২৩ সালে দুই দফায় ১৫ বছরের আমদানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার আওতায় ২০২৬ সাল থেকে আরও এলএনজি সরবরাহের কথা রয়েছে। কিন্তু এই সম্পূর্ণ সরবরাহের পথই হরমুজ প্রণালিনির্ভর।
পেট্রোবাংলার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “সব এলএনজি কার্গো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। স্থলপথে বা অন্য কোনো নৌপথে আমদানি সম্ভব নয়। প্রণালি বন্ধ হলে সংকট অনিবার্য।”
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে পরিশোধিত তেলের ২০% এবং অপরিশোধিত তেলের ৩০% আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স ও পরিকল্পনা) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান বলেন, “আমরা তেলের দাম নির্ধারণ করি আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ লোডের আগ-পিছের ছয় দিনের গড় দামে। দাম বাড়লে আমদানির খরচও বাড়বে, ফলে ভোক্তা পর্যায়েও প্রভাব পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে আমাদের নিজস্ব পরিশোধনাগারে আমদানি সীমিত হবে। যদিও কিছু বেসরকারি প্ল্যান্ট বিকল্প পথ ব্যবহার করে থাকে, তবে তাদের সক্ষমতা সীমিত।”
জ্বালানি খাতে সংকট মোকাবেলায় সরকার এখন বিকল্প উৎস ও পরিবহন পথ খুঁজছে। যদিও এলএনজি ক্ষেত্রে বিকল্প কার্যত অনুপস্থিত, তবে তেলের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের কিছু উদ্যোগ আংশিক সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছে বিপিসি।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। এটি বন্ধ হয়ে গেলে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই জ্বালানি সঙ্কটে পড়তে পারে। এখন দেখার বিষয়—সাম্প্রতিক উত্তেজনা কোথা পর্যন্ত গড়ায় এবং বৈশ্বিক কূটনীতি কতটা কার্যকর হয় এই সংকট সমাধানে।

