দীর্ঘ ১৭ বছরের শাসনের পর পদত্যাগ করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উদ্ভূত গণআন্দোলন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ নামে জায়গা করে নিয়েছে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই দেশে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, যা আগামী ৬ মাসের মধ্যে একটি জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আন্দোলনের সূচনা: কোটা সংস্কার থেকে গণআন্দোলনে রূপান্তর
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার ঘিরেই মূলত এই আন্দোলনের সূচনা হয়। ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের রায়ে কোটা পুনর্বহাল করা হলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুরু করেন ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি। সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, শাহবাগ অবরোধ—একটি পরিণত আন্দোলনে রূপ নেয়।
সরকারের অবস্থান, বিতর্কিত মন্তব্য ও প্রতিবাদের বিস্তার
১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক মন্তব্য, “মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা কোটা পাবে না তো রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে?”—নতুন করে আগুন লাগায়। আন্দোলনকারীরা ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার-রাজাকার’ স্লোগানে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে মিছিল করে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্রথম শহীদ ও ক্ষোভের বিস্ফোরণ
১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলনে প্রাণ ফিরে আসে। এই হত্যাকাণ্ড সারাদেশে আন্দোলনকারীদের ঐক্যবদ্ধ করে। ৩ আগস্ট ‘এক দফা—সরকার পতন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
৫ আগস্ট: ইতিহাসের দিন
৫ আগস্ট ঢাকা অভিমুখে ‘লং মার্চ’ শুরু হয়। লক্ষাধিক মানুষ ঢাকার দিকে রওনা দেয়। প্রশাসনের বিপুল প্রস্তুতির পরেও জনস্রোত থামানো যায়নি। সেই দিন সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং তার দেশের বাইরে চলে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।
নতুন সূচনা: অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা
৬ আগস্ট সকালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে ঘোষণা আসে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের। এই সরকার আগামী ছয় মাসের মধ্যে একটি ‘সবার অংশগ্রহণে’ অবাধ নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “এটি ছিল রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস ও জনগণের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভের একটি বিস্ফোরণ।” কোটা ছিল কেবল একটি উপাদান, মূলত দুর্বিনীত ক্ষমতা, মতপ্রকাশের অধিকার হরণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি।

