বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
Logo

আরাকান আর্মির নতুন দমননীতি: রোহিঙ্গাদের জীবন আরও অনিশ্চিত

ডেস্ক রিপোর্ট।।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির দখলে থাকা এলাকাগুলোয় রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। সংস্থাটি বলছে, চলাফেরা, জীবিকা, আবাসন ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার থেকেও রোহিঙ্গারা বঞ্চিত হচ্ছেন।

এইচআরডব্লিউ-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জমি দখল, জোরপূর্বক শ্রম, শিশু-কিশোরদের বাধ্যতামূলক নিয়োগ, মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারসহ রোহিঙ্গাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে একরকম ‘ঘেরাটোপের জীবন’।

নিষেধাজ্ঞার ঘেরাটোপে রোহিঙ্গারা

রাখাইনের বুথিডং টাউনশিপ থেকে পালিয়ে আসা একাধিক রোহিঙ্গা জানান, গ্রাম ছেড়ে বের হতে হলে প্রয়োজন হতো আরাকান আর্মি ও স্থানীয় প্রশাসকের যৌথ সইসহ অনুমতিপত্র। তারও খরচ ছিল তিন থেকে পাঁচ হাজার কিয়াত পর্যন্ত।

৬২ বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা বলেন, “কাজ করতে, মাছ ধরতে, এমনকি নিজের জমিতে যেতে পারতাম না। রাতে কেউ ঘরে না থাকলে ধরে নিয়ে যেত, অনেকে আর ফেরেনি।”

শিশুদের কাজে বাধ্য করা, বাবাকে নির্যাতন

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শিশু-কিশোরদের নিয়োগের অভিযোগও। ৫৭ বছর বয়সী এক বাবা জানান, “আরাকান আর্মি আমার ১৭ বছরের ছেলেকে খুঁজছিল। তাকে লুকিয়ে রেখেছিলাম। পরে আমাকে আটক করে ৩৫ দিন নির্যাতন চালানো হয়।”

আরেক ঘটনায়, ছেলেকে না পাওয়ায় প্রতিশোধ হিসেবে তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন এক রোহিঙ্গা পরিবার।

জমি-কবরস্থান দখল, মানবঢালের অভিযোগ

বুথিডংয়ের দুই বাসিন্দা জানান, আরাকান আর্মি পারিবারিক কবরস্থান দখল করে সেখানে ধান লাগিয়েছে। আর এক তরুণ বলেন, “আমাদের যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইনে পাঠানো হতো, যেন শত্রুর গুলিতে আমরা আগে পড়ি। কেউ প্রতিবাদ করলে মারধর করতো।”

তিনি আরও জানান, আরাকান আর্মির সদস্যরা রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে ‘বাঙালি কালার’ বা ‘তোমাদের বর্মীদের মতোই ব্যবহার করব’ বলেও হেনস্তা করতো।

পালাতেও দিতে হয় ঘুষ

প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, বাংলাদেশে ঢোকার জন্য পাচারকারীদের দিতে হয়েছে ৮ থেকে ১২ লাখ কিয়াত পর্যন্ত ঘুষ।
২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা।

নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অবস্থা নেই

বাংলাদেশ সরকার বলছে, রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান হচ্ছে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন। তবে জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমান রাখাইন পরিস্থিতি সে প্রত্যাবাসনের উপযোগী নয়।

এইচআরডব্লিউর আহ্বান

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া পরিচালক ইলেইন পিয়ারসন বলেন, “আরাকান আর্মিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। দাতাগোষ্ঠী ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকেও আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”


রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নের ধরন এখন আর শুধু রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বেসরকারি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর পরিণতি হতে পারে আরও অনিরাপদ শরণার্থীপ্রবাহ এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তায় নতুন অনিশ্চয়তা।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন