২১ জুলাইয়ের দুপুর। রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরমান হোসেন মোস্তফা। হঠাৎই আকাশ থেকে হু-হু করে নেমে আসে একটি যুদ্ধবিমান। সোজা গিয়ে বিধ্বস্ত হয় কলেজের হায়দার আলী ভবনে। মুহূর্তেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে আগুন, আতঙ্ক, আর্তনাদ।
কিন্তু সেই ভয়াবহ মুহূর্তে দৌড়ে পালিয়ে না গিয়ে মোস্তফা ছুটে যায় বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দুর দিকে—সহপাঠীদের উদ্ধারে। আগুনে পোড়া, রক্তাক্ত এক বন্ধুকে ধরে সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল সে। সেই দৃশ্য ধরা পড়ে একটি ভিডিওতে, যা থেকে নেওয়া একটি ছবি ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
ছবির নিচে লেখা হয়েছে এক হৃদয়স্পর্শী ক্যাপশন:
“আমার বন্ধু আমাকে দেখে হাসল এবং বলল—আমি জানতাম তুমি আসবে!”
এই একটি বাক্য যেন থমকে দিয়েছে হাজারো মানুষের হৃদয়, চোখে এনেছে জল।
আজ বিশ্ব বন্ধু দিবস। বন্ধুত্বের গভীরতা, আত্মত্যাগ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠেছে মোস্তফা ও তার বন্ধুর সেই মুহূর্ত। এটি শুধু একটি সাহসিকতার গল্প নয়—এটি বন্ধুত্বের প্রকৃত সংজ্ঞা।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনে বন্ধুত্বের এক নতুন সংজ্ঞা দেখা গেছে। গুলির মুখে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো, আহত বন্ধুকে কাঁধে তুলে নেওয়া, আন্দোলনের মাঠে একে অন্যের হাতে হাত রাখা—সবই ছিল সেই ‘বন্ধু’ শব্দের বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
রাজধানীর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুজাইফা, আবীর, বাবলু, রতন, শামীম, সুবর্ণা, কবিরসহ অসংখ্য তরুণ-তরুণী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছিলেন রাজপথে। আন্দোলনের পরও তাঁরা থেকেছেন একসঙ্গে, একাত্মতায়। দেয়ালে লিখেছেন স্লোগান, এঁকেছেন গ্রাফিতি—শহীদ বন্ধুদের স্মরণে।
বিশ্ব বন্ধু দিবস উপলক্ষে তরুণরা নানা পরিকল্পনা করছেন আজ। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী তন্ময় হালদার যাচ্ছেন পাহাড়ে ঘুরতে বন্ধুদের নিয়ে। ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী রফিকুল ইসলাম জানালেন, “বন্ধুদের সঙ্গে অফিস শেষে আজ একটি সংগীতসন্ধ্যার আয়োজন করেছি। আমরা একসঙ্গে গাইব, পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করব।”
গৃহবধূ সাবিহা নওয়ারা জানালেন, বন্ধুদের জন্য নিজেই কেক বানিয়েছেন। ইউটিউব দেখে কেক বানানো শেখা এই নারী বন্ধু দিবসে নিজ হাতে তৈরি কেক কেটে উদযাপন করবেন ঘরোয়া পরিসরে।
আর মাজহারুল আবেদিন মারুফ বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো পুরনো মুহূর্তের ছবি দিয়ে বানাচ্ছেন অ্যালবাম। বললেন, “এটা আমার দেওয়া সবচেয়ে ব্যক্তিগত উপহার হতে যাচ্ছে। বন্ধুদের অবাক করার জন্য মুখিয়ে আছি।”
বন্ধু দিবসে অনেকে উপহার দেন ফুল, চকলেট, বই কিংবা মগ। কিন্তু সবচেয়ে বড় উপহার? একসঙ্গে কাটানো সময় আর মন থেকে বলা কয়েকটি কথা।
আজকের এই দিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চরণই যেন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে—
“বন্ধু হে আমার, বন্ধু হে আমার, প্রেমেরই বাঁধনে বাঁধা তুমি আমার।”

