সোমবার (৫ আগস্ট) সকাল থেকে সিলেট শহরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। শহীদ মিনার এলাকায় সকাল ১০টা থেকে অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিট সোয়াটসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাব সদস্য। তাদের সঙ্গে ছিল সাঁজোয়া যানসহ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সদস্যরা। সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে আসা ছাত্র-জনতার মিছিলে অতর্কিতে হামলা চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মিছিলে দফায় দফায় ইট-পাটকেল ছোড়া এবং পাল্টা গুলিবর্ষণের ঘটনায় উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধের একমাত্র অস্ত্র ছিল রাস্তায় পড়ে থাকা ইটপাথর। সংঘর্ষের একপর্যায়ে সোয়াট বাহিনীর একজন সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। তাকে সঙ্গে সঙ্গে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার আজবাহার আলী শেখ, যিনি আগেরদিন ছররা গুলিতে আহত হন।
তবে দুপুর ১২টার দিকে আজবাহার আলীকে হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের পরিচালকসহ পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি হঠাৎ করেই হাসপাতাল ত্যাগ করেন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তিনিই সিলেটে হামলার অন্যতম নির্দেশদাতা।
কারফিউ উপেক্ষা করে হাজারো আন্দোলনকারী সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরে বিক্ষোভ তীব্রতর হয়। বন্দরবাজার, কোর্ট পয়েন্ট, মধুবন মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
দুপুর ২টায় সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার কথা থাকলেও সময় পিছিয়ে যায়। তবে এর মধ্যে শহরে ছড়িয়ে পড়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের গুঞ্জন। বিকেল ৪টার দিকে সেই গুঞ্জন সত্য বলে নিশ্চিত হওয়ার পর নগরীজুড়ে আনন্দ মিছিল বের হয়।
বিকেল থেকে হাজারো মানুষ রাজপথে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে। নারীরাও ঝড়ের বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নামেন। শহরের প্রতিটি পাড়া-মহল্লা থেকে মিছিল এসে মিলিত হয় চৌহাট্টার শহীদ মিনারে।
তবে এ উল্লাসের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে কিছু নৈরাজ্য। বিকাল ৩টার পর থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে সরকারি অফিস, রাজনৈতিক নেতাদের বাসা ও দোকানপাটে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। আগুন দেওয়া হয় পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসকের দপ্তর, কয়েকটি ফার্মেসি, ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।
অস্থির পরিস্থিতিতে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী শহরজুড়ে মাইকিং করে জনগণকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ বন্ধ করতে জনগণের সহযোগিতা চান।
আন্দোলনের সূত্রপাত হয় কোটা সংস্কার নিয়ে। তবে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায় ১৪ জুলাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্যের পর। সেদিন রাতেই শাবিপ্রবিতে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদ, যার কেন্দ্রে ছিলেন নারী শিক্ষার্থীরাও। এরপর থেকেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সিলেটজুড়ে।
এই আন্দোলনে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিহত হয়েছেন ১৩ জন। এর মধ্যে সিলেট শহরে ৪ জন (একজন সাংবাদিকসহ), গোলাপগঞ্জে ৬ জন, ও বিয়ানীবাজারে ৩ জন। নিহতদের তালিকা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

