জাতীয় পার্টির (জাপা) অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নতুন এক মোড় নিয়েছে, যেখানে দলের দুই প্রধান অংশ আজ পৃথক অবস্থানে দাঁড়িয়ে জাতীয় সম্মেলন ঘিরে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। একপক্ষ দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে কেন্দ্র করে ঐক্য ধরে রাখতে চাচ্ছে, অপরপক্ষ বহিষ্কৃত নেতাদের পুনর্বহাল করে ‘নতুন নেতৃত্বে’ এগিয়ে যেতে চাইছে।
গেলো ৩১ জুলাই আদালতের দেওয়া এক অন্তর্বর্তী আদেশে জি এম কাদেরের কিছু সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ এবং বহিষ্কৃত নেতাদের দলে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে জাপার রাজনীতিতে ফের উত্তাপ ছড়িয়েছে। আজ (শনিবার) রাজধানীর গুলশানে একটি পার্টি সেন্টারে যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তা নিয়েই দ্বিমত চূড়ান্ত আকার ধারণ করেছে।
দলের চেয়ারম্যান পন্থিদের মতে, আদালতের আদেশে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান পদে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়নি। সেহেতু তার অনুমোদন ছাড়া কেউ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বা কাউন্সিল আহ্বান করতে পারেন না। অন্যদিকে বহিষ্কৃত ও পুনর্বহাল নেতারা বলছেন, আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাদের সাংগঠনিক অবস্থান পুনরুদ্ধার হয়েছে, তাই তারা সম্মেলন করার অধিকার রাখেন।
জাপার একাংশের নেতৃত্বে থাকা ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আজকের সম্মেলন প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা আদালতের নির্দেশনা ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এগোচ্ছি। একক নেতৃত্ব নয়, সম্মিলিত নেতৃত্বের মাধ্যমে দলকে নতুনভাবে গঠন করবো।” তিনি আরও বলেন, “সম্মেলনের মাধ্যমে বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিল করা হবে।”
অন্যদিকে জাপার মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী এ সম্মেলনকে “অবৈধ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে অভিহিত করে বলেন, “চেয়ারম্যান সুস্থ ও সচল আছেন। তিনি কাউকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেননি। কাজেই আজকের সম্মেলন মূলত দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের স্পষ্ট উদাহরণ।”
জি এম কাদেরপন্থিদের অভিযোগ, জাতীয় পার্টির অভ্যন্তরীণ বিরোধকে উসকে দিতে সরকারের একটি মহল নিরবভাবে ইন্ধন জোগাচ্ছে। একাধিক সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কিছু নেতা এই বিভক্তি কাজে লাগিয়ে জাপাকে ‘নির্বাচনকালীন সহায়ক শক্তি’ হিসেবে পুনর্বিন্যাস করতে চাইছেন।
জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মনিরুল ইসলাম মিলন বলেন, “প্রতিবার দল যখন ভাঙনের মুখে পড়ে, তখন সরকারের ছায়া দেখা যায়। এবারও কিছু সুযোগসন্ধানী নেতা সরকারের ছত্রছায়ায় থেকে দল ভাঙার পথে এগোচ্ছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পার্টির এ বিভাজন দলটির ভবিষ্যত অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই দ্বন্দ্বের ফলাফল নির্ভর করবে সরকারের ‘রূপরেখা ও প্রয়োজন’ অনুযায়ী কোন অংশটি টিকে থাকবে তার উপর।
দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ যে এখানেই শেষ হচ্ছে না তা স্পষ্ট। আজকের সম্মেলনের বৈধতা নিয়েও হয়তো আদালতে আবার নতুন করে চ্যালেঞ্জ আসবে। ফলে আগামী দিনগুলোতে জাপার রাজনীতিতে আইনি ও সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব আরও গভীর হতে পারে।

