এক সময় যেখান থেকে বিশ্বের দশটি দেশে পণ্য রপ্তানি হতো, আজ সেখানে শুধু পোড়া গন্ধ আর নিশ্চুপ নীরবতা। রাজবাড়ীর অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ‘গোল্ডেশিয়া জুট মিলস লিমিটেড’—যা এক বছর আগে দুর্বৃত্তদের আগুনে ভস্মীভূত হয়েছিল—সেটি এখনও পুনর্গঠিত হয়নি। ১৬০০ শ্রমিক-কর্মচারী এখনো বেকার, অনিশ্চয়তার গাঢ় অন্ধকারে দিন কাটছে তাদের।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরদিন রাতে এই মিলটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর দুর্বৃত্তরা আগুন ধরিয়ে দেয়, যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো মিলজুড়ে। আগুনে পুড়ে যায় অফিস ভবন, গোডাউন, উৎপাদনশেড, কাঁচামাল, রপ্তানিযোগ্য পণ্য, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যবস্থাও।
আগুন নেভাতে রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পদ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত মিলটি চালু হয়নি।
শ্রমিক হাসিনা বেগম বলেন, “এই মিলেই ৭ বছর কাজ করেছি। আগুন লাগার পর থেকে সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। কবে মিল চালু হবে তা কেউ বলতে পারে না।”
আরেক শ্রমিক মিলন জানান, “মিলটা চালু না হলে আমরা আরও দিশেহারা হয়ে যাব। অনেকে অপেক্ষায় বসে আছে—কাজের আশায় অন্য কোথাও যায়নি।”
মিলের সিনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার নিপুন আহমেদ বলেন, “নিজ হাতে বসানো মেশিনগুলোর এখন শুধু কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিণতি কল্পনাও করিনি। এই মিল কেবল একটি কারখানা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের অংশ।”
মিলের উপমহাব্যবস্থাপক খায়রুল ইসলাম জানান, “আমরা মিল চালুর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ব্যাংক ও সরকারের সহায়তা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। আগুনে ১৬০০ কর্মজীবী মানুষের জীবন থমকে গেছে। মিলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অনেক ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গেছে।”
মিল চত্বরে এখন স্তব্ধতা। প্রধান ফটকে ঝুলছে ইসলামী ব্যাংকের দায়বদ্ধতার বিজ্ঞপ্তি। পোড়া ভবনগুলো যেন স্মরণ করিয়ে দেয় সেদিনের বিভীষিকা। গেটের পাশে অলস সময় পার করছেন কয়েকজন কর্মকর্তা, যারা আজও মিল চালুর আশায় অপেক্ষায়।
সিকিউরিটি ম্যান ওসমান গনি বলেন, “সেদিন আমি নাইট ডিউটিতে ছিলাম। আগুন দেখে ভয় পেয়ে ভেতরে ঢুকতে পারিনি। পরে এসে দেখি, সব কিছু ছাই হয়ে গেছে। আজও শ্রমিকরা এসে জানতে চায় কবে মিল চালু হবে—কিন্তু আমার কিছু বলার থাকে না।”
মিল কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রশাসন বা সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় পুনর্গঠন সম্ভব হচ্ছে না। এক বছর ধরে চেষ্টার পরও প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবে থমকে আছে মিলের কার্যক্রম।

