রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

কেয়া কসমেটিকস বনাম ব্যাংক: রপ্তানি আয়ের ৬৬ কোটি ডলার ‘উধাও’

ডেস্ক রিপোর্ট।।

দেশের অন্যতম শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড এবং চারটি ব্যাংকের মধ্যে বহুমাত্রিক আর্থিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, ২০০৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬৬ কোটি মার্কিন ডলার (৮,০৫২ কোটি টাকা) রপ্তানি আয় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো তাদের ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্টে জমা না করায় তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোর দাবি, কেয়া কসমেটিকস নিজেই খেলাপি; প্রতিষ্ঠানটির কাছে তাদের প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকার ঋণ পাওনা রয়েছে। বিষয়টি এখন একটি জটিল আর্থিক বিরোধে রূপ নিয়েছে।

কেয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রপ্তানির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকগুলো তাদের এফসি অ্যাকাউন্টে হস্তান্তর করেনি। এতে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আমদানি বিল পরিশোধ, বেতন দেওয়া এবং উৎপাদন কার্যক্রমে চরম সংকটে পড়েছে।

একাধিক চিঠির মাধ্যমে কেয়া কসমেটিকস বিষয়টি সম্পর্কে অর্থ উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিএসইসি ও ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলকে (FRC) অবহিত করেছে এবং সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

কেয়া গ্রুপ দাবি করেছে, এই অর্থ সঠিকভাবে জমা দেওয়া হলে ব্যাংকগুলোর ঋণ পাওনার ভারসাম্যও অনেকটা সমাধান হয়ে যেত।

কোন কোন ব্যাংক জড়িত? কী বলছে তারা?

1.সাউথইস্ট ব্যাংক

২০০৪-২০২৩ পর্যন্ত প্রায় ১০২ কোটি ডলার রপ্তানির মধ্যে ৩৯.৪৬ কোটি ডলার কেয়া কসমেটিকসের এফসি অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি বলে অভিযোগ।
 ব্যাংক বলছে: “এ ধরনের কোনো অনিয়ম হয়নি, অডিট রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি।”

2.পূবালী ব্যাংক

২০ কোটি ডলারের রপ্তানির বিপরীতে কোনো অর্থ জমা না দেওয়ার অভিযোগ।
 ব্যাংকের এমডি আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।

3.ন্যাশনাল ব্যাংক

৭ কোটি ডলারের রপ্তানির পর ৫.৮৫ কোটি ডলার জমা হয়নি বলে দাবি।
 ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেছেন, “নো কমেন্টস।”

4.স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক

৬৫ লাখ ডলারের রপ্তানির সম্পূর্ণ অর্থ জমা না দেওয়ার অভিযোগ।
 ব্যাংকের এমডি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “এটি ভুল তথ্য।”

কেয়া গ্রুপ জানায়, এসব আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে গড়ে ১ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে। প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক, যার মধ্যে ১,০০০ জন প্রতিবন্ধী, চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠান বলেন,

“আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের বড় একটি অংশ গায়েব হয়ে গেছে। এটি শুধুই কেয়া নয়, বরং পুরো দেশের বৈদেশিক রিজার্ভের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।”

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) বিষয়টি তদন্তে একটি অডিট ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে। অডিট কার্যক্রম শেষ হলেও প্রতিবেদন এখনও প্রকাশিত হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো বক্তব্য দেয়নি।

বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন,

“যদি কেয়া কসমেটিকসের অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি। আবার, যদি ব্যাংকের দাবি সত্য হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে, এত বড় খেলাপি প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর কীভাবে কার্যক্রম চালিয়েছে?”

কেয়া কসমেটিকস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে চলমান বিরোধ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, রপ্তানি খাত এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিবিদ ও শিল্প মালিকরা দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন