বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভ এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজধানী জাকার্তাসহ বড় শহরগুলোতে লাখো মানুষ রাস্তায়, সরকারি কার্যালয় ঘেরাও, কোথাও কোথাও সহিংসতা। মূল ইস্যু ছিল আইনপ্রণেতাদের বাড়ি ভাড়ার ভাতা—কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নিয়েছে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে।
ঘটনার সূত্রপাত সংসদ সদস্যদের জন্য মাসিক প্রায় ৩ হাজার ডলারের বাড়িভাড়ার ভাতা ঘোষণা থেকে। যা দেশটির গড় শ্রমিক মজুরির প্রায় ১০ গুণ। তথ্যটি প্রকাশ্যে আসতেই নেমে আসে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণ।
পরবর্তীতে, পুলিশের নির্যাতন, রাজনৈতিক দুর্নীতি, বেকারত্ব—সব কিছু মিলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
২১ বছর বয়সী খাবার ডেলিভারি কর্মী আফ্ফান পুলিশের একটি গাড়ির ধাক্কায় নিহত হলে ক্ষোভ আরও তীব্র হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ঘটনাটি ছিল ইচ্ছাকৃত। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ক্লিপ আন্দোলনকে আরও উসকে দেয়।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য—এর নেতৃত্বহীনতা। কোনও রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত তরুণদের উদ্যোগেই আন্দোলন চলছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, এটি বাংলাদেশে জুলাই মাসে হওয়া গণঅভ্যুত্থানের মতোই একটি ‘ডিজিটাল-চালিত, নেতৃত্ববিহীন আন্দোলন’।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণজাগরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে ইন্দোনেশিয়ার তরুণরা। বিশেষ করে নেতৃত্বহীন, অরাজনৈতিক স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ কীভাবে রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে পারে, তা তারা বুঝেছে।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুভিয়ান্তো আন্দোলনকে “অরাজকতার পরিকল্পনা” বলে অভিহিত করেছেন। ইতোমধ্যে সেনা-পুলিশ মোতায়েন, কারফিউ, শত শত তরুণ গ্রেপ্তার—এসব দৃশ্য দমননীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জাতিসংঘ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়েছে।
এমপিদের ভাতা বাতিল ছাড়াও বিক্ষোভকারীরা চাইছেন—
-
পুলিশি জবাবদিহিতা
-
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন
-
শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধি
-
স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ
-
কর্মসংস্থানের সুযোগ
এ দাবিগুলো “১৭+৮ রিফর্ম প্ল্যান” নামে ছড়িয়ে পড়েছে টিকটক ও এক্স-এ।
বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ১৯৯৮ সালের আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে, যখন প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর পতন হয়েছিল। তবে এখনো সরকারের পতনের দাবি স্পষ্ট নয়—বিক্ষোভকারীরা মূলত সংস্কারেই জোর দিচ্ছেন। তবে দমননীতি অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের অনুরণন ইন্দোনেশিয়ার রাস্তায়ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—তরুণদের সোশ্যাল মিডিয়া-নির্ভর, নেতৃত্বহীন আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

