বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
Logo

শেখ মুজিব এই বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি: বদরুদ্দীন উমর

ডেস্ক রিপোর্ট।।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ইতিহাসচর্চার এক প্রখর ভাষ্যকার বদরুদ্দীন উমর আর নেই। রোববার (৭ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে ৯৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বামধারার প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী, গবেষক ও লেখক।

তাঁর মৃত্যুতে দেশের প্রগতিশীল আন্দোলন, ইতিহাসচর্চা এবং রাজনৈতিক চিন্তায় এক গভীর শূন্যতা তৈরি হলো—মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষকদের মতে, উমরের বিকল্প আর আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকাই স্বাভাবিক।

১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভারতের বর্ধমানে জন্ম নেওয়া বদরুদ্দীন উমর ছিলেন একাধারে ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজতাত্ত্বিক এবং ভাষা আন্দোলনের অন্যতম চিন্তানায়ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনে স্নাতকোত্তর এবং পরবর্তীতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিলোসফি, পলিটিক্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স (PPE) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

উমরের চিন্তা ও লেখায় সবসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ ছিল স্পষ্ট। তার বিশ্লেষণে বারবার উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, বাঙালি পরিচয়, আওয়ামী লীগ এবং শেখ মুজিবের ভূমিকাসহ বহু বিতর্কিত ও বিতর্ক উসকে দেওয়া বক্তব্য।

২০২3 সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দীন উমর বলেন,

“স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস আজও লেখা হয়নি। যেটা লেখা হয়েছে সেটা ৮০-৯০ শতাংশই মিথ্যা।”

তিনি স্পষ্ট করেন, শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা চাননি, বরং পাকিস্তানের ভেতরেই সর্বোচ্চ ক্ষমতা চেয়েছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণকে তিনি বলেছিলেন “চাপের মুখে দেওয়া আবেগতাড়িত বক্তৃতা”, যেখানে স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষণার কোনো রাজনৈতিক রূপরেখা ছিল না।

বদরুদ্দীন উমরের স্পষ্ট ভাষায় বক্তব্য শুধু একাডেমিক মহলে নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোড়ন তুলেছিল। শেখ মুজিবের ২৫ মার্চ রাতে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন—

“ওটা গ্রেপ্তার নয়, আত্মসমর্পণ। শেখ মুজিব পালাতে বলেন আর নিজে বসে থাকেন — এর অর্থ তিনি ধরা পড়তে প্রস্তুত ছিলেন।”

এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও তিনি কখনও নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।

বদরুদ্দীন উমর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনচেতনার বিস্ফোরণ বলে উল্লেখ করেছিলেন। শেখ হাসিনার সরকার পতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন—

“৫ আগস্ট, ২০২৪ বাংলাদেশ রাহুমুক্ত হয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান ১৯৫২, ৬৯ কিংবা ৯০-এর চেয়েও বড় পরিসরে সংঘটিত হয়েছে।”

তিনি দাবি করেন, এই পরিবর্তনের ফলে “আওয়ামী ফ্যাসিবাদ” থেকে মুক্তি পেয়েছে দেশ এবং অন্তর্বর্তী সরকার সেই শূন্যতা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে প্রগতিশীল সমাজ যেমন শোকাহত, তেমনি ইতিহাসের বিকল্প পাঠপ্রেমী পাঠকরা হারালেন তাঁদের সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান কণ্ঠকে।

তাঁর রচিত বই, নিবন্ধ ও বক্তৃতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে।

প্রয়াত বদরুদ্দীন উমরের কিছু আলোচিত রচনা:

  1. ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক পটভূমি

  2. স্বাধীনতা সংগ্রাম: ইতিহাস ও বিভ্রান্তি

  3. জাতি, জাতীয়তা ও শ্রেণি

  4. বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস: একটি সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

জনগণের অধিকার, বিকল্প ইতিহাসচর্চা এবং প্রগতিশীল চিন্তার যে বাতিঘর বদরুদ্দীন উমর, তিনি থাকবেন তাঁর লেখার পাতায়, পাঠকের মননে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন