ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ফল প্রকাশ ঘিরে আবারও শুরু হয়েছে বিতর্ক। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলাফলের সঙ্গে হলভিত্তিক ভোটের তথ্যের মধ্যে গরমিল পাওয়া গেছে অন্তত ১৮ জন প্রার্থীর ক্ষেত্রে। কেউ কেউ পেয়েছেন ঘোষিত চেয়ে কম ভোট, আবার কারও ভোট বেড়ে গেছে চূড়ান্ত ফলে।
ভোটের এই অসামঞ্জস্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, এটি কেবল মাত্র ‘টাইপিং মিসটেক’। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, এটি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের গাফিলতির ইঙ্গিত দেয়।
পরিবহন সম্পাদক পদে নির্বাচিত আসিফ আব্দুল্লাহ পেয়েছেন ৯১০১ ভোট, কিন্তু ফলাফলে লেখা হয়েছে ৯০৬১—৪০ ভোট কম। একইভাবে ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক মাজহারুল ইসলামের প্রকৃত ভোট ৯৮৪৪ হলেও ঘোষিত ফলে তা ৯৩৪৪। ক্রীড়া সম্পাদক পদে চিম চিম্যা চাকমার প্রকৃত ভোট ৩৮৮৮, ফলাফলে উল্লেখ ৩৭৮৮—১০০ ভোট কম।
অন্যদিকে, সাহিত্য সম্পাদক পদে মো. লানজু খান, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে মোহাম্মদ সাকিব এবং সদস্য পদে সর্বমিত্র চাকমা, আবিদ আব্দুল্লাহসহ অনেকের ফলেও দেখা গেছে গড়মিল।
একইসঙ্গে এমনও দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন প্রার্থী ঘোষিত ফলে পেয়েছেন ‘বেশি’ ভোট। সহসভাপতি পদে রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের প্রকৃত ভোট ৬, অথচ ঘোষিত ফলে লেখা হয়েছে ৮। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে দুই প্রার্থী ফাতিন ইশরাক ও ফারহান লাবিব পেয়েছেন যথাক্রমে ১০ ও ৪০ ভোট বেশি।
এই গরমিলের কারণ হিসেবে চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. জসীম উদ্দিন বলেন, “এগুলো টাইপোলজিক্যাল ভুল। ভোট গণনার সময় ক্লান্তি ও ঘুমের কারণে কিছু ভুল হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হিসাবই সঠিক। শিগগিরই সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হবে।”
ফলাফল ঘোষণার চারদিন পরও পুরো নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র মেলেনি। অনেক হলে মোট ভোট পড়েছে কত, বাতিল হয়েছে কত—সেসব তথ্যই অনুপস্থিত। কেবল ছয়টি হলেই দেখা গেছে বাতিল ও অনুপস্থিত ভোটের বিবরণ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন ভুল শুধুই ‘টাইপিং’ না, বরং এটি স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল নির্বাচনের অভাবের ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভোটে এ ধরনের ত্রুটি বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ভোট গরমিল নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে সাহিত্য সম্পাদক প্রার্থী মো. লানজু খান ফেসবুকে লিখেছেন, “হলভিত্তিক ভোটে আমার ভোট ১৫৭১ হলেও ফলাফলে লেখা হয়েছে ১৫৩১। ধন্যবাদ ঢাবি প্রশাসন, আপনাদের চোখ বন্ধ করেই বিশ্বাস করা যায়।”
আন্তর্জাতিক সম্পাদক প্রার্থী মোহাম্মদ সাকিব বলেন, “শিক্ষার্থীদের রায়কে সম্মান জানিয়ে নির্বাচন মেনে নিলেও এ ধরনের ভুল দুঃখজনক। আমি এ ভুলের দলিল সংরক্ষণ করলাম।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ভোট ত্রুটি নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ডাকসুর মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে এমন ভুল কি শুধু অসাবধানতা, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও কিছু?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন চাপে রয়েছে দ্রুত সংশোধিত ফল প্রকাশ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে। শিক্ষার্থীরা চাইছেন, ভবিষ্যতে এমন ভুল যেন আর না ঘটে এবং প্রশাসন যেন দায় এড়িয়ে না যায়।

