বগুড়া শহরে প্রতিদিনই ডাস্টবিনে চলে যাচ্ছে প্রায় দুই টন রান্না করা খাবার। হোটেল-রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুড দোকান, কমিউনিটি সেন্টার—সবখানেই অতিরিক্ত রান্না হওয়া খাবারের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে বা ফেলা হচ্ছে নর্দমায়। এতে যেমন অপচয় হচ্ছে মূল্যবান সম্পদের, তেমনি বাড়ছে দুর্গন্ধ, বর্জ্য ও পরিবেশ দূষণ।
বগুড়ায় বর্তমানে ৫০০টির বেশি হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। স্থানীয় হোটেল মালিকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিটি হোটেলে গড়ে ৫-২০ কেজি রান্না করা খাবার প্রতিদিন অবশিষ্ট থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি, শহরের ২৫টির বেশি কমিউনিটি সেন্টারে প্রতিদিন সামাজিক অনুষ্ঠান হওয়ায় অতিরিক্ত খাবার অপচয় হচ্ছে নিয়মিত।
পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মী আকরাম মিয়া বলেন, “হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্যের ৬০-৭০ শতাংশই খাবার। গরমে এগুলো দ্রুত পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা পরিষ্কার রাখার পরও সমস্যা তৈরি করে।”
হোটেল মালিকদের মতে, বিক্রির অনিশ্চয়তা, ক্রেতার রুচির পরিবর্তন ও প্রতিযোগিতার চাপই খাবার অপচয়ের মূল কারণ।
“কম রান্না করলে বিক্রির সময় খাবার থাকবে না, আবার বেশি করলেই নষ্ট হয়,” — বলেন এক হোটেল মালিক।
অনেকেই জানান, অবশিষ্ট খাবার দান করতে চাইলেও নিরাপত্তা, সংরক্ষণের অভাব ও সময়ের কারণে তা সম্ভব হয় না।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, “এক কেজি ভাত বানাতে লাগে প্রায় ৩ লিটার পানি। প্রতিদিন দুই টন খাবার নষ্ট মানে হাজার হাজার লিটার পানি, গ্যাস ও শ্রমের অপচয়। এটা শুধু খাবারের অপচয় নয়, পুরো সম্পদ ব্যবস্থার ব্যর্থতা।”
শিক্ষক মতিউর রহমান এবং এনজিওকর্মী কে জি এম ফারুকের মতে, হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোর অবশিষ্ট ভালো খাবার সংগ্রহ করে রাতের বেলায় অসহায়দের মাঝে বিতরণ করা যেতে পারে। পৌরসভা ও স্থানীয় এনজিওগুলো মিলে চালু করতে পারে ‘ফুড ব্যাংক’।
দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনায়, সুষ্ঠু সংরক্ষণে এই উদ্যোগ খাদ্য নিরাপত্তা ও মানবিকতার বড় উদাহরণ হতে পারে।
বগুড়া পৌরসভার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হোটেল মালিকদের সহযোগিতা পেলে পরীক্ষামূলকভাবে ফুড রিকভারি প্রকল্প চালু করা সম্ভব। অন্যদিকে পরিবেশবিদ মাসুদ রানা বলেন, “এই অপচয়ের ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস তৈরি হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ। যদি এই খাবার পুনর্ব্যবহার হয়, তাহলে একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার পৌঁছাবে, অন্যদিকে পরিবেশ বাঁচবে।”
এনজিওকর্মী আব্দুল হালিম বলেন, “একদিকে মানুষ ক্ষুধায় ঘুমায়, আর অন্যদিকে সেই শহরে দুই টন খাবার ফেলে দেওয়া হয়— এটা শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, এটি এক ধরনের নৈতিক অপরাধ।”

