গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ আন্তর্জাতিক আইনে সর্বোচ্চ মাত্রার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রনেতারা এ ধরনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন, কেউ কারাগারে থেকেছেন, আবার অনেকের বিচার অসমাপ্ত অবস্থায় শেষ হয়েছে।
সোমবার বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের বিক্ষোভ চলাকালে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত দমন-পীড়নের নির্দেশদান। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় পাঁচ বছরের দণ্ডে দণ্ডিত হন।
২৩০ বছর পর কোনো নারী সরকারপ্রধানের মৃত্যুদণ্ড
এই রায়ের মধ্য দিয়ে ২৩০ বছর পর আবারও কোনো নারী সরকারপ্রধান মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলেন। এর আগে ১৭৯৩ সালে ফ্রান্সের রানি মারি এন্তনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল, ফরাসি বিপ্লবের সময়।
ইতিহাসে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত রাষ্ট্রনেতারা
সাদ্দাম হোসেন (ইরাক)
ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ২০০৩ সালে গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৮২ সালের দুজাইল ঘটনায় ১৪৮ জন শিয়া নাগরিক হত্যার অভিযোগে ইরাকি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০০৬ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
কিম জং ইল (উত্তর কোরিয়া)
যদিও আন্তর্জাতিক আদালতে তার বিচার হয়নি, বিভিন্ন জাতিসংঘ প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার শাসনামলে ব্যাপক নিপীড়ন, দুর্ভিক্ষ এবং মানবতাবিরোধী আচরণের অভিযোগ করেছে। তিনি ২০১১ সালে হৃদরোগে মারা যান।
পল পট (কম্বোডিয়া)
১৯৭৫–৭৯ সালে খেমাররুজদের নেতৃত্ব দেওয়া পল পটের শাসনামলে ১৭–২২ লাখ মানুষ মারা যায় বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তার বিচার শুরু হওয়ার আগেই ১৯৯৮ সালে তার মৃত্যু হয়।
স্লোবোদান মিলোশেভিচ (সার্বিয়া)
বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও কসোভোতে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে তার বিচার চলছিল। ২০০৬ সালে বিচার চলাকালে কারাগারে তার মৃত্যু হয়।
ওমর আল-বশির (সুদান)
দারফুরে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২০১৯ সালে তিনি সুদানে ক্ষমতাচ্যুত হন এবং পরে দোষী সাব্যস্ত হন।
হিসেন হাব্রে (চাদ)
১৯৮২–১৯৯০ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা হাব্রের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার মানুষের হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। সেনেগালের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
রাদোভান কারাদজিক (বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা)
১৯৯৫ সালের স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যায় তার দায় প্রমাণিত হয়। আন্তর্জাতিক আদালত ২০১৯ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
জোসেফ কাবিলা (ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো)
২০২১ সালে একটি সামরিক আদালত তার অনুপস্থিতিতে দেশদ্রোহিতা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।
ইতিহাসে রাষ্ট্রপ্রধানদের মৃত্যুদণ্ড
বিভিন্ন সময় গণহত্যাসহ নানা অপরাধে বিশ্বের অনেক সরকারপ্রধান মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন:
-
ইয়ন আন্তোনেস্কু (রোমানিয়া) — দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
-
নিকোলাই চাউসেস্কু (রোমানিয়া) — ১৯৮৯ সালে বিপ্লবের সময় স্ত্রীর সঙ্গে গুলি করে হত্যা
-
জুলফিকার আলি ভুট্টো (পাকিস্তান) — ১৯৭৯ সালে হত্যার অভিযোগে ফাঁসি
-
ষোড়শ লুই (ফ্রান্স) — ১৭৯৩ সালে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড
-
মারি এন্তনে (ফ্রান্স) — একই বছর মৃত্যুদণ্ড
-
প্রথম চার্লস (ইংল্যান্ড) — ১৬৪৯ সালে শিরশ্ছেদ
-
অ্যান বলিন (ইংল্যান্ড) — ১৫৩৬ সালে কুঠারাঘাতে মৃত্যুদণ্ড
-
আদনান মেন্দারেস (তুরস্ক) — ১৯৬১ সালে ফাঁসি
-
মোহাম্মদ মুরসি (মিসর) — মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা হয়েছিল, তবে ২০১৯ সালে আদালতেই মৃত্যু

