বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
Logo

ভাসানচর থেকে রোহিঙ্গাদের পলায়ন বাড়ছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা

ডেস্ক রিপোর্ট।।

মিয়ানমারের নির্যাতনের মুখে দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তর করেছিল গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। তবে সীমিত কর্মসংস্থান, চিকিৎসা সংকট ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে সেখান থেকে পালিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা—এমন তথ্য উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় এক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে।

গোয়েন্দাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে পলায়নের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের মানুষের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পালানো কঠিন হলেও দালালচক্র জনপ্রতি ৩–৪ হাজার টাকা নিয়ে কাঠের নৌকায় রোহিঙ্গাদের নোয়াখালী বা চট্টগ্রামে পৌঁছে দিচ্ছে। রাতের অন্ধকারে রোহিঙ্গারা প্যারাবন এলাকায় জড়ো হয়ে জোয়ার-ভাটার সময় নৌকায় উঠে পালিয়ে যায়।

কেউ কেউ স্বর্ণদ্বীপ বা জাইজ্জারচর পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে সেখান থেকে নৌকায় ফের মূল ভূখণ্ডে আসে। পরিবার বড় হলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কমাতে তারা পর্যায়ক্রমে পালিয়ে যায়।

২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ভাসানচরে স্থানান্তর শুরু হয়। নভেম্বর পর্যন্ত ৩৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে সেখানে নেওয়া হয়, নতুন জন্মসহ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৪০ হাজারে। কিন্তু প্রতিনিয়ত পালিয়ে যাওয়ায় বর্তমানে সেখানে রোহিঙ্গার সংখ্যা নেমে এসেছে ২৯ হাজার ৮৪২ জনে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ৯টি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হয়েছে—

কর্মসংস্থানের অভাব,চিকিৎসা সুবিধার সংকট,শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া,কক্সবাজারে এফসিএন কার্ড নবায়নের সুযোগ,একাধিক স্ত্রী থাকা ও দ্বৈত অবস্থানের কারণে পলায়ন প্রবণতা,ক্যাম্পের বাইরে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা,রোহিঙ্গা রিলোকেশন স্থগিত হওয়া,আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শিথিল তদারকি,উন্নত জীবনের আশায় অন্য জেলায় যাওয়া।

কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোয় অবাধে কাজ পাওয়ার সুযোগ থাকায় ভাসানচরের তুলনায় সেখানে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মো. এমদাদুল ইসলাম বলেন—
“ভাসানচরে স্থানান্তর কোনো সমাধান নয়। কাজ নেই, শিক্ষা নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই—এ অবস্থায় রোহিঙ্গারা পালাবে, এটাই স্বাভাবিক। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরুতে ভাসানচরে হাসপাতাল, চিকিৎসক ও জরুরি সেবা চালু থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব সেবা কমে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসা নিতে নোয়াখালীতে পাঠানো রোগীরা নানা হয়রানির শিকার হন।

এ ছাড়া মাদ্রাসা-ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের শিক্ষা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ বেড়েছে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পলায়ন রোধে পাঁচটি সুপারিশ রয়েছে—

ভাসানচরে ক্ষুদ্র ও স্বল্প আকারে জীবিকা কর্মসূচি চালু করা,সীমিত আকারে রোহিঙ্গা স্থানান্তর অব্যাহত রাখা,সরকারি চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা,নিয়মিত ঔষধ সরবরাহ বজায় রাখা,শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা।

এছাড়া কোস্টগার্ড ও এপিবিএনের লজিস্টিক সুবিধা বাড়ানো এবং পালানোর রুটে নিয়মিত টহল বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ইউএনএইচসিআর বলছে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের মতো হলেও স্থানীয় প্রশাসনের হিসেবে তা আরও বেশি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন স্থগিত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।

তাদের মতে, চীনের সঙ্গে বর্তমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নতুন করে জোরদার করতে পারে সরকার।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন