দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর জনসমর্থনের ঢেউ তুলেছিল যেসব ছাত্রনেতা, তাদের তৈরি রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি) এখন ভোটের রাজনীতিতে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। চলতি বছরের শুরুতে দল গঠনের ঘোষণা দিলে ব্যাপক ভিড় জমেছিল সমাবেশে—কিন্তু সেই উত্তাপ ভোটে রূপ দিতে পারছে না দলটি।
আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিতে চাইলেও দলটিকে এখন লড়তে হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন ও বিপুল সম্পদের মালিক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে।
আন্দোলনের পরিচিত মুখ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন,
“সংগঠন গড়ার মতো সময় আমাদের হাতে ছিল না। আমরা দুর্বলতা জানি, তবুও চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছি।”
মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনে স্বল্প সময় দায়িত্ব পালন করা নাহিদ আরও বলেন, জনমতের সমর্থন থাকলেও মাঠ পর্যায়ের কাঠামো এখনো ঠিকমতো দাঁড়ায়নি।
ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (IRI) সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে—
-
বিএনপি: ৩০% সমর্থন
-
জামায়াতে ইসলামী: ২৬%
-
এনসিপি: মাত্র ৬%
জরিপ বিশ্লেষকদের মতে, মাঠের রাজনীতির বাস্তবতা এখনো দলটির পক্ষে নয়।
ছাত্র আন্দোলনের সময় এনসিপির প্রতি আস্থা রাখা তরুণদের একাংশ এখন হতাশ।
নারীবাদী কর্মী প্রাপ্তি তাপসী বলেন—
“তারা নিজেদের মধ্যপন্থী বলে, কিন্তু সংখ্যালঘু বা নারী অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেরিতে সাড়া দেয়। এটাই হতাশার কারণ।”
ডাকসু নির্বাচনে দলটির প্রার্থীরা একটিও আসন না পাওয়াকেও বিশ্লেষকরা দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রতিফলন বলছেন।
নেতারা নিশ্চিত করেছেন, কাঠামোগত দুর্বলতা ও তহবিল সংকট কাটাতে বিএনপি, জামায়াতসহ কয়েকটি দলের সাথে জোট নিয়ে আলোচনা চলছে।
দলের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—
“স্বাধীনভাবে দাঁড়ালে হয়তো একটি আসনও পাওয়া সম্ভব হবে না।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ সতর্ক করে বলেন—
“জোট করলে এনসিপির স্বতন্ত্র ‘বিপ্লবী’ পরিচিতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
প্রচারের অর্থ জোগাড়ে এনসিপি নির্ভর করছে ক্রাউডফান্ডিং ও ছোট অনুদানের ওপর।
গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন—
“নেতার কাজ টাকা বিলানো নয়, বরং সরকারি তহবিল সঠিকভাবে বরাদ্দ করা।”
কয়েকজন নেতা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও এনসিপি তা অস্বীকার করেছে।
তরুণদের একটি অংশ এখনো এনসিপির প্রতি আশাবাদী।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী মনজিলা রহমান বলেন—
“তারা তরুণ এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে। নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা আছে, যদি তারা ক্ষমতায় গিয়ে কঠোর না হয়ে ওঠে।”
দলটি গত নভেম্বর দেশব্যাপী উন্মুক্ত প্রার্থী বাছাই আয়োজন করে—যেখানে অংশ নেন রিকশাচালক থেকে শুরু করে আন্দোলনে আহত তরুণ পর্যন্ত।
কেমব্রিজের চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে দলটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া তাসনিম জারা বলেন—
“রাজনীতিকে পরিবারতন্ত্রের বাইরে এনে সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে চাই।”
এনসিপি নেতাদের দাবি, শুধু আসন্ন নির্বাচন নয়, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কারই তাদের মূল লক্ষ্য।
হাসনাত আবদুল্লাহর ভাষায়—
“জিতি বা হারি—আমরা নতুন কিছু অফার করছি।”

