অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই সময়টাকে দীর্ঘদিন ধরেই পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতার মৌসুম হিসেবে ধরা হতো। দেশীয় উৎপাদন থাকলেও বাজার নির্ভর করত ভারতীয় আমদানির ওপর। ফলে একদিকে কৃষক ন্যায্য দাম পেতেন না, অন্যদিকে সামান্য সরবরাহ সংকটেই বাজার অগ্নিমূল্যে পৌঁছাত। তবে চলতি মৌসুমে সেই চিত্র বদলেছে।
এবার দেশের বাজারে পেঁয়াজের জোগান এসেছে মূলত দেশীয় উৎপাদন থেকেই। কৃষকেরা পাচ্ছেন লাভজনক দাম, আর আমদানিনির্ভরতা কমে যাওয়ায় সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশে—বাংলাদেশের বাজার না পেয়ে ভারতীয় কৃষকেরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
চলতি মৌসুমের শুরুতেই সরকার পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। লক্ষ্য ছিল পুরোপুরি দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরতা গড়ে তোলা। বাজারে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে মাত্র দুবার সীমিত আকারে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়, কেবল দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য। এর ফলে কৃষকের স্বার্থ যেমন সুরক্ষিত হয়েছে, তেমনি আমদানিতে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণ কমেছে। যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমদানি ছিল ১০ লাখ টনের বেশি, সেখানে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমদানি হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৬০০ টন।
অন্যদিকে উৎপাদনে ঘটেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে উৎপাদন ছিল ৩৪ লাখ টন, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার টনে। চলতি অর্থবছরে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪২ লাখ ৬৪ হাজার টন, যা দেশের বার্ষিক চাহিদার চেয়েও বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সাফল্যের পেছনে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে—সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন, উন্নত বীজের প্রাপ্যতা এবং বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ। আগে সঠিক সংরক্ষণ না থাকায় উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়ে যেত। এখন ‘এয়ার-ফ্লো’ প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই ক্ষতি অনেকটাই কমে এসেছে। ইতোমধ্যে ২৫টি জেলায় প্রায় চার হাজার এয়ার-ফ্লো সংরক্ষণ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।
বীজ উৎপাদনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগে উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন বেড়েছে। বারি উদ্ভাবিত গ্রীষ্ম ও শীতকালীন জাতের কারণে এখন সারাবছরই পেঁয়াজ চাষ সম্ভব হচ্ছে।
বাজার ব্যবস্থাপনায়ও কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সেপ্টেম্বরের আগে আমদানির অনুমতি না দেওয়ায় সক্রিয় সিন্ডিকেট দুর্বল হয়ে পড়ে। ডিসেম্বরে দাম হঠাৎ বাড়লে সীমিত আকারে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়, যার ফলে এক দিনের মধ্যেই দাম স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে।
কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, কৃষি খাতের নীতি ও প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কৃষকের কল্যাণ নিশ্চিত করা। উন্নত বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি ও ন্যায্য দাম—এই তিন বিষয়ে জোর দেওয়ার ফলেই পেঁয়াজ উৎপাদনে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে।

