বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
Logo

যে মাদ্রাসায় বেড়ে উঠেছিলেন ওসমান হাদি

ডেস্ক রিপোর্ট।।

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার খাসমহল এলাকায় এক সম্ভ্রান্ত আলেম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শরিফ ওসমান হাদি। ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধে বেড়ে ওঠা এই তরুণ চিন্তাবিদ ছিলেন একটি ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাকেন্দ্রিক পরিবারের সন্তান। তার বাবা মাওলানা আব্দুল হাদি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান মাদ্রাসা শিক্ষক। পরিবারের প্রায় সবাই দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ওসমান হাদি শৈশব থেকেই মেধা ও ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। ঝালকাঠির এন এস কামিল মাদ্রাসায় তার শিক্ষাজীবনের সূচনা। শিক্ষার্থী হিসেবেই তিনি হয়ে ওঠেন ব্যতিক্রম—তুখোড় মেধাবী, সাবলীল বক্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠ। ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী মনোভাব ও নেতৃত্বগুণ তার মধ্যে স্পষ্ট ছিল।

একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি তার প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্মৃতি গভীর আবেগের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যদি আল্লাহ তাকে আবার পৃথিবীতে পাঠান, তবে তিনি আবারও সেই মাদ্রাসাতেই পড়তে চান। তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন—বাংলাদেশে খুব কম মানুষই কল্পনা করতে পারে যে একটি মাদ্রাসায় রবীন্দ্রনাথের নাটক মঞ্চস্থ হয়। ছাত্রজীবনে তিনি জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক, বক্তৃতা ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় একাধিকবার প্রথম স্থান অর্জন করেন।

ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, তার একার নয়—ওই প্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষার্থীই জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেয়েছে। মাদ্রাসাটিতে সংগীত ও সংস্কৃতির চর্চা ছিল নিয়মিত। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, জারি ও ভাটিয়ালির মতো লোকসংগীত সেখানে লালিত হতো। ধর্মীয় পরিবেশের কারণে নৃত্য বাদে প্রায় সব সাংস্কৃতিক চর্চাই ছিল সেখানে স্বাভাবিক।

মাদ্রাসা জীবন শেষে ওসমান হাদি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে (২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ)। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি প্রাইভেট পড়ানোসহ সাইফুর’সের মতো নামী কোচিং প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি অব স্কলারসে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

শিক্ষকতা ও সমাজসেবার পাশাপাশি সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ২০২৪ সালের জুলাই মাসের আন্দোলনে তার সাহসী অবস্থান ও নেতৃত্ব তাকে তরুণ সমাজের অনুপ্রেরণার প্রতীকে পরিণত করে।

আন্দোলনকালে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে প্রকাশ্যে জীবনের ঝুঁকির কথা জানালেও তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন—“ইনসাফের লড়াই থেকে আমি পিছিয়ে যাব না।”

মেধা, সংগ্রাম ও সাহসিকতায় ভর করে শরিফ ওসমান হাদি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে রেখে গেছেন এক উজ্জ্বল ও অনন্য স্মৃতি।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন