অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে জোটের প্রার্থী হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয় জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতের আশঙ্কা, এই দুই সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন বিতর্ক ও অভিযোগের দায় শেষ পর্যন্ত জামায়াত-এনসিপি জোটকেই বহন করতে হতে পারে। পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো জোটটিকে সরকারের মদদপুষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করে নির্বাচনী প্রচারে আক্রমণ চালাতে পারে বলে মনে করছে দলটি।
জামায়াত-এনসিপির সম্ভাব্য জোট আলোচনা সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, এনসিপি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—মাহফুজ ও আসিফকে প্রার্থী করা না হলে তারা জোটে আসতে আগ্রহী নয়। এ দুই নেতাও নিজেদের দলীয় অবস্থান ও প্রার্থিতা নিশ্চিত না হলে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যেতে রাজি নন। এ অবস্থানকে কেন্দ্র করে এনসিপির ভেতরেও মতভেদ দেখা দিয়েছে। তাদের একাংশ বিএনপির সঙ্গে জোটের পক্ষে মত দিচ্ছেন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
এদিকে, এনসিপিকে আগে চারটি আসন ছাড়ার প্রস্তাব দিলেও বিএনপি বর্তমানে এ বিষয়ে আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে জানা গেছে।
গত বুধবার এনসিপির নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ সদস্য জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের পক্ষে মত দেন। পরে এ সিদ্ধান্তের লিখিত কার্যবিবরণী প্রস্তুত করে জামায়াত আমিরের সঙ্গে বৈঠকে বসেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা। আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তবে এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে দলটির অন্য নেতাদের নিষেধ করা হয়েছে।
এনসিপি সূত্র জানায়, দলের শীর্ষ নেতাদের একটি অংশ—বিশেষ করে কয়েকজন নারী নেতা—ধর্মভিত্তিক দল জামায়াতের সঙ্গে জোটে আপত্তি জানিয়েছেন। তাদের ক্ষোভ সামাল দিতে আলোচনার পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রার্থিতার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, একজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং আরেকজন উপদেষ্টা থাকাকালে প্রকাশ্যে জামায়াত ও এর আদর্শিক অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, এ ধরনের ব্যক্তিকে জোটের প্রার্থী করলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা যাবে এবং সাংগঠনিকভাবে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
জামায়াতের মূল্যায়নে, দুই সাবেক উপদেষ্টার সঙ্গে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দ্বন্দ্বও রয়েছে। ফলে তাদের প্রার্থী করা হলে সরকারপন্থী কিংবা সরকারবিরোধী—উভয় দিক থেকেই চাপের মুখে পড়তে পারে জোট, যা নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এনসিপির আরেক শরিক এবি পার্টিও জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দলটির এক নেতা জানান, জামায়াত দুই সাবেক উপদেষ্টাকে নিয়ে অনাগ্রহের কথা স্পষ্ট করেছে।
আসিফ মাহমুদ ইতোমধ্যে ঢাকা-১০ আসন থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। তিনি আগে বিএনপি সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। এনসিপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, আসিফ এনসিপিতে যোগ দিয়ে জামায়াত জোটের প্রার্থী হতে প্রস্তুত রয়েছেন। একইভাবে মাহফুজ আলমও এনসিপিতে যোগ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন।
জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে প্রাথমিকভাবে ৩০ আসন নিয়ে আলোচনা হলেও এনসিপি আরও ১০–২০টি আসনে প্রার্থী দিতে চায়। তবে জামায়াত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—জোটের বাইরে অতিরিক্ত প্রার্থী দিলে জোটের কাঠামো ভেঙে পড়বে।
এদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফতসহ অন্যান্য শরিকদের সঙ্গেও আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন অন্তত ৩০–৩৫টি আসন দাবি করলেও জামায়াত তাতে পুরোপুরি সম্মত নয়। এতে জোটের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে আসন্ন নির্বাচনের আগে জামায়াত নেতৃত্বাধীন সম্ভাব্য জোটে আসন বণ্টন ও প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে জটিলতা কাটেনি। আলোচনা অব্যাহত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয় কি না, সে দিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

