রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ‘রাশিয়ান স্যাংশনস বিল’ নামে পরিচিত এই প্রস্তাব অনুমোদনের প্রাথমিক ধাপ পেরোলেও এখনো চূড়ান্ত ভোটাভুটি হয়নি। তবে বিলটি পাস হলে ভারতসহ কয়েকটি দেশের ওপর সরাসরি চাপ বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই বিলের মূল লক্ষ্য রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করা। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো যাতে রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কেনা বন্ধ করে, সে জন্যই শুল্ককে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায় ওয়াশিংটন।
ভারতের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তেল ক্রেতা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর কম দামে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কিনে উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হয় দেশটি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের চাপের মুখে ভারত ধীরে ধীরে আমদানি কমিয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুনে দৈনিক প্রায় ২১ লাখ ব্যারেল রাশিয়ান তেল আমদানি করলেও ডিসেম্বর নাগাদ তা প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ভারতের বৃহত্তম রিফাইনারি সংস্থা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ জানিয়েছে, চলতি জানুয়ারিতে তারা রাশিয়া থেকে তেল সরবরাহ পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে না।
তবুও প্রস্তাবিত ৫০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে ভারতকে হয় রাশিয়ার তেল পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে, নতুবা যুক্তরাষ্ট্রের বাজার কার্যত হারানোর ঝুঁকি নিতে হবে।
বাণিজ্যে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব সতর্ক করে বলেছেন, এই শুল্ক আরোপ হলে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে ভারত বছরে প্রায় ৮৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে, যা মোট রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
তার মতে, বিলটি কংগ্রেসে পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও ভারতের উচিত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা। তিনি বলেন, “ভারত যদি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত হিসেবে রাশিয়া থেকে তেল কিনতে চায়, তাহলে তা খোলাখুলি বলা উচিত। কিন্তু রাশিয়ার তেল কমিয়ে আবার মার্কিন শুল্কের চাপও সহ্য করা—দুটো একসঙ্গে সম্ভব নয়।”
চীন থাকছে আলোচনার বাইরে?
ভারতের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য ইকোনমিক টাইমস দাবি করেছে, এই বিলের বাস্তব লক্ষ্য মূলত ভারত, যেখানে চীন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে থাকবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ান তেল কেনার কারণে এখন পর্যন্ত শুধু ভারতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, অথচ চীনের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বিলটি সিনেটে পাস হলেও বাস্তবে এটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
ট্রাম্পের নীতি ও অনিশ্চয়তা
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও এই শুল্কনীতি নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাকে থামাতে পারে শুধু তার নিজের নীতি ও সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক আইন বা বহুপাক্ষিক নিয়মের চেয়ে নিজের সিদ্ধান্তকেই তিনি অগ্রাধিকার দেন বলে মন্তব্য করেন।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ভারত-নেতৃত্বাধীন ইন্টারন্যাশনাল সোলার অ্যালায়েন্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ থেকেও সরে দাঁড়িয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলছে।
ভূ-রাজনীতির বড় খেলায় ভারত
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান দরকষাকষিতে ভারতকে চাপের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই শুল্ক বিল কার্যকর হলেও প্রেসিডেন্টের ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকায় ইউরোপীয় দেশগুলো তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারে।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার তেল, মার্কিন শুল্ক ও চীন-ভারত সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ভারতের বৈদেশিক নীতি ও বাণিজ্য কৌশল এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

