বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
Logo

সুই–সুতার শব্দে লেখা এক নারীর বিজয়গাথা

লালমনিরহাট প্রতিনিধি

লালমনিরহাটের বড়বাড়ী বাজারে পা রাখলেই কোলাহলের ভিড় ছাপিয়ে কানে আসে সেলাই মেশিনের একটানা শব্দ। এই যান্ত্রিক শব্দ যেন কেবল কাপড় সেলাইয়ের নয়—এ শব্দ সংগ্রাম, স্বপ্ন আর আত্মনির্ভরতার গল্প শোনায়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই শব্দের সঙ্গেই নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ গড়ে তুলেছেন নারী উদ্যোক্তা সান্ত্বনা রানী রায়।

এক সময়ের অভাবী গৃহিণী আজ তিনি শত শত নারীর অনুপ্রেরণার নাম।
সান্ত্বনা রানীর জীবনের শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ১৯৯২ সালে দিনমজুর স্বামীর সংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’—এমন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পাস সান্ত্বনা বুঝেছিলেন, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হলে কেবল ভাগ্যের অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। দরকার দক্ষতা, সাহস আর কঠোর পরিশ্রম। সেই বিশ্বাস থেকেই জীবনের হাতিয়ার হিসেবে তিনি বেছে নেন সেলাইয়ের কাজ।

অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আরডিআরএস থেকে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। যাতায়াত ভাড়ার টাকা না থাকায় অনেক দিন হেঁটেই প্রশিক্ষণে যেতেন। কিন্তু ক্লান্তি কিংবা কষ্ট কখনোই তাকে থামাতে পারেনি। অবশেষে ২০০০ সালে মাত্র ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বড়বাড়ী বাজারে গড়ে তোলেন নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘এস বি টেইলার্স’।

শুরুতে ছোট একটি দোকান, হাতে গোনা কয়েকজন ক্রেতা। কিন্তু সততা, দক্ষতা আর আন্তরিকতায় ধীরে ধীরে তার দোকান হয়ে ওঠে আস্থার ঠিকানা। আজ ‘এস বি টেইলার্স’ শুধু একটি টেইলার্স শপ নয়—এটি নারীদের আত্মবিশ্বাস ফেরানোর এক শক্ত ভরসা। বছরে এখান থেকে তার আয় প্রায় আড়াই লাখ টাকা। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন সম্পদ, বাড়িতে পালন করছেন গবাদিপশু।

সুই–সুতার ফোঁড়েই বদলে গেছে সান্ত্বনা রানীর সংসার। যে ঘরে একসময় দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা ছিল না, সেই ঘরেই আজ শিক্ষার আলো জ্বলছে। তার উপার্জনের টাকায় বড় মেয়ে পড়ছেন ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে। ছোট মেয়ে পড়াশোনা করছেন লালমনিরহাট মজিদা খাতুন সরকারি মহিলা কলেজে।

নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে সান্ত্বনা রানী রায় বলেন,
“২৫ বছর ধরে এই বাজারে দোকান করছি। শুরুটা ছিল ভীষণ কষ্টের। অনেক দিন হেঁটেই কাজ শিখতে গেছি। তবে পরিবার সবসময় পাশে ছিল। সবচেয়ে ভালো লাগে এই ভেবে যে, আমার হাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। আমার শেষ ইচ্ছা—দুই মেয়েই যেন উচ্চশিক্ষিত হয়ে সরকারি কর্মকর্তা হতে পারে।”
আজ সান্ত্বনা রানীর ‘এস বি টেইলার্স’ গ্রামীণ নারীদের জন্য এক নীরব পাঠশালা। এখানে তিনি বিনামূল্যে হাতে–কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন প্রায় ২০০ নারীকে। অনেকেই আজ নিজ নিজ সংসারের হাল ধরেছেন তার শেখানো দক্ষতায়।

প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া রুজিনা বেগম বলেন, আগে দিনমজুরের কাজ করতাম। কাজ না থাকলে না খেয়ে থাকতে হতো। বৌদির কাছে কাজ শিখে এখন তার দোকানেই কাজ করছি। এখন সংসারে আর অভাব নেই।

আরেক প্রশিক্ষণার্থী রিনা রানী বলেন,
“বিয়ের পর সংসারের চাপে সেলাই শেখা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে দিদির কাছে এসে কাজ শিখেছি। এখন বাড়তি আয়ে অনেক স্বস্তিতে আছি।”

স্থানীয়দের চোখে সান্ত্বনা রানী শুধু একজন উদ্যোক্তা নন, তিনি নারী ক্ষমতায়নের এক জীবন্ত উদাহরণ।

স্থানীয় ব্যবসায়ী দীপক কুমার রায় বলেন, “তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসহায় নারীদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এতে নারীরা কারো কাছে হাত না পেতে নিজেরাই সংসার চালাতে পারছে।”

বড়বাড়ী বাজারের বাসিন্দা অরুন কুমার পাটোয়ারী মনে করেন,
“নারীরা পুরুষদের দোকানে অনেক সময় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। সান্ত্বনা রানীর মতো নারী উদ্যোক্তা থাকায় বাজারে নারীদের কাজ অনেক সহজ হয়েছে।”

অভাবের অন্ধকার পেরিয়ে সেলাই মেশিনকে শক্তি বানিয়ে সান্ত্বনা রানী রায় আজ প্রমাণ করেছেন—সাহস আর পরিশ্রম থাকলে নারীরাও বদলে দিতে পারেন নিজের ভাগ্য, বদলে দিতে পারেন সমাজের চিত্র।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন