রাশিয়ায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বেসামরিক চাকরির আশ্বাসে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে ঠেলে দেওয়ার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের এইভাবে প্রতারণার মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।
এপির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভুয়া চাকরির চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ায় আনা এসব শ্রমিকদের জোরপূর্বক সামরিক চুক্তিতে সই করানো হয়। পরে তাদেরকে যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হচ্ছে। আদেশ অমান্য করলে মারধর, বন্দিত্ব এমনকি মৃত্যুর হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এপির সঙ্গে কথা বলেছেন রাশিয়ার সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসতে সক্ষম তিন বাংলাদেশি। তাদের একজন মাকসুদুর রহমান। তিনি জানান, মস্কোতে পৌঁছানোর পর রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজে সই করতে বাধ্য করা হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, সেগুলো আসলে সামরিক নিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তি।
চুক্তিতে সই করানোর পর তাদের একটি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে ড্রোন পরিচালনা, ভারী অস্ত্র ব্যবহার এবং আহত সেনাদের উদ্ধারসহ প্রাথমিক যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার আগে তাদেরকে সামনে পাঠানো হতো। তাদের কাজ ছিল রসদ বহন, আহত সেনাদের উদ্ধার এবং নিহতদের মরদেহ সরিয়ে আনা। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা নিখোঁজ তিন বাংলাদেশির পরিবারও ফোনালাপে শুনেছেন বলে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে এপির পক্ষ থেকে প্রশ্ন পাঠানো হলেও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকার—কেউই কোনো মন্তব্য করেনি।
এপির অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের পক্ষে বিভিন্ন নথি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভিসা সংক্রান্ত কাগজপত্র, সামরিক চুক্তি, চিকিৎসা রিপোর্ট, পুলিশি নথি ও ছবি। এসব নথিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের যুদ্ধ অংশগ্রহণ ও আহত হওয়ার প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
যদিও ঠিক কতজন বাংলাদেশি এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তা নিশ্চিত নয়, তবে এপির সঙ্গে কথা বলা শ্রমিকরা জানিয়েছেন—ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে তারা শত শত বাংলাদেশিকে রুশ বাহিনীর সঙ্গে কাজ করতে দেখেছেন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই ধরনের সামরিক নিয়োগের লক্ষ্যবস্তু শুধু বাংলাদেশ নয়; আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ভারত ও নেপালের নাগরিকদেরও এতে জড়ানো হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরার পর কাজের সন্ধানে ছিলেন মাকসুদুর রহমান। এ সময় এক দালাল তাকে রাশিয়ার একটি সামরিক ক্যাম্পে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির প্রস্তাব দেয়। মাসিক এক থেকে দেড় হাজার ডলার বেতন ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগের কথাও বলা হয়।
অন্যদিকে, মোহন মিয়াজী নামে আরেক বাংলাদেশি রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের একটি গ্যাস কারখানায় কাজ করতে গিয়ে চরম প্রতিকূল পরিবেশে পড়েন। পরে অনলাইনে নতুন কাজ খুঁজতে গিয়ে তিনি একজন রুশ সামরিক নিয়োগকারীর সঙ্গে যোগাযোগে আসেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাকে অধিকৃত আভদিভকা শহরের একটি সামরিক ক্যাম্পে নেওয়া হয়। সেখানে নিজের নিয়োগপত্র দেখিয়ে বেসামরিক কাজের কথা বললে আদেশ অমান্যের অভিযোগে তাকে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

