বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়া। রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, প্রচারণা ও জনমত গঠনে এই প্ল্যাটফর্মগুলো এখন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনা গণতন্ত্রের জন্য নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
নির্বাচনের আগে বা রাজনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বনেতাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বিভ্রান্তি ছড়ানো, ভুয়া ঘোষণা দেওয়া কিংবা অস্থিরতা সৃষ্টির প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বারাক ওবামা, জো বাইডেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইলন মাস্ক, নরেন্দ্র মোদী কিংবা ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ—কেউই এই সাইবার হামলা থেকে রেহাই পাননি।
২০২০ মার্কিন নির্বাচন: ওবামা–বাইডেনসহ একযোগে হ্যাক
২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চার মাস আগে এক্স (তৎকালীন টুইটার) এক নজিরবিহীন সাইবার হামলার মুখে পড়ে। জো বাইডেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ইলন মাস্ক ও বিল গেটসসহ বহু ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট একযোগে হ্যাক করা হয়।
হ্যাকাররা ক্রিপ্টোকারেন্সি দ্বিগুণ করে ফেরত দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে পোস্ট দেয় এবং প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ডলার হাতিয়ে নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এক্স কর্তৃপক্ষ ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টগুলোর পোস্ট করার ক্ষমতা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। যদিও সরাসরি নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব পড়েনি, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে আসে।
ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট: দুর্বল পাসওয়ার্ড থেকে রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনা ছিল ভিন্ন মাত্রার। ডাচ সাইবার গবেষক ভিক্টর গেভার্স দাবি করেন, কোনো জটিল প্রযুক্তি ছাড়াই তিনি ট্রাম্পের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাসওয়ার্ড ছিল অত্যন্ত সহজ।
যদিও হোয়াইট হাউজ এ দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি, তবু বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনেতার ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে ট্রাম্পের অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু করা হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আবারও ট্রাম্পের প্রচারণা টিম জানায়, ইরানি হ্যাকাররা তাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে সংবেদনশীল নথি ফাঁস করেছে।
২০১৬ নির্বাচন ও রাশিয়ান হ্যাক
২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনের আগে ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কমিটির (ডিএনসি) ই-মেইল হ্যাক করে তথ্য ফাঁস করা হয়, যার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগ উঠে। এর ফলে ডিএনসি চেয়ারম্যান ডেবি ওয়াসারম্যান শুলজ পদত্যাগ করেন এবং হিলারি ক্লিনটনের প্রচারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি ভোটিং মেশিনে হস্তক্ষেপ না হলেও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা ছিল।
মোদী ও ম্যাক্রোঁ: ভুয়া ঘোষণার রাজনীতি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অ্যাকাউন্ট একাধিকবার হ্যাক হয়। এক ঘটনায় বিটকয়েনকে বৈধ ঘোষণা করার ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়, যা সাময়িক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপে বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
ফ্রান্সে ২০১৭ সালের নির্বাচনের আগে ‘ম্যাক্রোঁলিকস’ কাণ্ড ইউরোপজুড়ে আলোড়ন তোলে। ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর প্রচারণা দলের ইমেইল ও নথি ফাঁস করে নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হয়। যদিও শেষ পর্যন্ত ম্যাক্রোঁ জয়ী হন, ঘটনাটি বিদেশি সাইবার হস্তক্ষেপের ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার অভিযোগ ওঠে। হ্যাক করা অ্যাকাউন্ট থেকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পোস্ট দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, দ্রুতই অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ উদ্ধার করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নিরাপত্তার কথা বললেও ব্যবহারকারীর অসতর্কতা, দুর্বল পাসওয়ার্ড কিংবা অভ্যন্তরীণ টুলসের অপব্যবহার বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
নির্বাচনের সময়ে এই ধরনের সাইবার হামলা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়—এটি সরাসরি একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জনমত ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন আর প্রযুক্তিগত ইস্যু নয়; এটি গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত হয়ে উঠেছে।

