ঢাকার ব্যস্ত সড়কে অটোরিকশা চালাতে চালাতে রুবেল চাকলাদারের কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে হতাশাই বেশি। ৫০ বছর বয়সী এই চালকের মতে, ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সামনে যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগানো যায়নি।
তার ভাষায়, “আমরা ড. ইউনূসকে ঠিকমতো কাজ করতে দেইনি। সবাই নিজের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে। এখন মনে হয়—এই দেশ আর কখনো ঠিক হবে না।”
২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের পর শেখ হাসিনার পতনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নাটকীয় রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়ায়। ছাত্র আন্দোলনের চাপে পদত্যাগের মাত্র তিন দিনের মাথায় নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। সহিংস সেই অভ্যুত্থানে নিহত হন এক হাজার চারশোর বেশি মানুষ।
উচ্চাশা ও সীমাবদ্ধতার সরকার
৮৫ বছর বয়সী ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমিত সময়ের মধ্যেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেন—বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্র ঠেকাতে কাঠামোগত সংস্কার।
কিন্তু ১৮ মাস পেরোতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐক্য ও প্রশাসনিক সমর্থন ছিল ভঙ্গুর। প্রশাসনের ভেতরের প্রতিরোধ, রাজনৈতিক দলগুলোর বিভাজন এবং অনির্বাচিত সরকারের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা ইউনূস সরকারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এখন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে, ইউনূসের উত্তরাধিকার নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে—তিনি কি রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করেছেন, নাকি অভ্যুত্থানের কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন?
‘সবার কাছে গ্রহণযোগ্য’ মুখ
ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের কাছে ড. ইউনূসের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থান। তৈরি পোশাকনির্ভর অর্থনীতি যাতে ধসে না পড়ে, সে আশ্বাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রধান ও সাবেক ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, “ওই মুহূর্তে আমাদের এমন একজন দরকার ছিল, যিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। ড. ইউনূস ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায়নি।”
তবে ইউনূসের নিয়োগ সর্বসম্মত ছিল না বলেও দাবি করেছেন আন্দোলনের আরেক নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে—বিশেষ করে সেনাবাহিনীর একটি অংশে—আপত্তির কথা আলোচনায় এসেছিল, যদিও এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
সংস্কার বনাম বাস্তবতা
ইউনূস সরকার নির্বাচিত সংসদ না থাকায় বিশেষজ্ঞ কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা চিহ্নিত করা এবং কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। নির্বাচন, সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে একাধিক কমিশন গঠিত হয়।
বিশেষভাবে আলোচিত হয় গুম ও গোপন আটককেন্দ্র তদন্ত কমিশন। কমিশন প্রায় দুই হাজার অভিযোগ নথিভুক্ত করে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পদ্ধতিগত অপরাধের চিত্র তুলে ধরে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি ইউনূস সরকারের সবচেয়ে সাহসী উদ্যোগ।
তবে সমালোচকদের মতে, অনির্বাচিত সরকার খুব অল্প সময়ে খুব বেশি কিছু করতে চেয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিলারা চৌধুরীর মতে, আমলাতান্ত্রিক সংস্কারে প্রত্যাশা ও অর্জনের মধ্যে বড় ফাঁক রয়ে গেছে।
গণভোটের ঝুঁকি
ইউনূসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত ছিল—নির্বাচনের পাশাপাশি সংস্কার প্রস্তাবগুলোর ওপর গণভোট আয়োজন। সমর্থকদের মতে, দমনমূলক কাঠামো ভাঙতে জনগণের সরাসরি অনুমোদন জরুরি। তবে ভোটাররা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই অনিশ্চয়তাই ইউনূসের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিভক্ত রাজনৈতিক মূল্যায়ন
বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “স্বল্প সময়ে সবকিছু করার প্রবণতা ছিল।” তবে তিনি নির্বাচন আয়োজনকে ইউনূসের বড় সাফল্য হিসেবে স্বীকার করেন।
এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী আরও গভীর সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিলেও বাস্তব সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছে।
ইতিহাস কী বলবে?
২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের কাছে ইউনূস মূলত ন্যায়বিচারের প্রতীক। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশের চোখে তিনি রয়ে গেছেন ‘হারানো সুযোগের’ মুখ।
ঢাকার যানজটে আবার অটোরিকশা চালাতে চালাতে রুবেল চাকলাদার বলেন, “আমি ভোট দেবো। কিন্তু পরিবর্তনের আশা নিয়ে নয়। করার মতো আর কিছু নেই বলেই।”
ড. ইউনূস চলে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি যে প্রশ্নগুলো রেখে যাচ্ছেন—বাংলাদেশ কি সত্যিই বদলাতে পেরেছে, নাকি শুধু আরেকটি অস্বাভাবিক অধ্যায় পার করল—তার উত্তর দেবে ইতিহাসই।

