বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
Logo

শুরুতেই হোঁচট খেল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ

ডেস্ক রিপোর্ট।।

সংবিধান সংস্কার বিষয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এর ফলে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনসহ সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। তবে আদেশের ৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্ধারিত দ্বৈত শপথ ঘিরে শুরুতেই সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক।

গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল—একটি সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। কিন্তু সংবিধানে পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথের বিধান অন্তর্ভুক্ত না থাকায় বিএনপি জোট ও স্বতন্ত্র বিজয়ীরা দ্বিতীয় শপথ নেননি। তারা কেবল এমপি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। অন্যদিকে জামায়াত ও তাদের মিত্র এনসিপিসহ কয়েকটি দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দুটি শপথই গ্রহণ করেন।

এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিএনপির নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় শুরুতেই একটি জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিরোধ না বাড়িয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করা হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির আদেশ প্রদানের কোনো ক্ষমতা নেই। তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু আলী রীয়াজ সাহেব এটা পেলেন কোথায়? এটা কোনো নির্বাহী আদেশ হতে পারত। অথবা কোনো অঙ্গীকার হলে সেটা মানত। এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ সংবিধানসম্মত হয়নি। সংবিধানকে সংবিধানসম্মতভাবেই চলতে দিতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুটি শপথের কথা বলা হয়েছে। এটা পেল কোথায়? কেন তারা দুটো শপথ নেবে? দুটো শপথের বিষয়টি তো সংবিধানে থাকতে হবে। তার প্রেসক্রাইবড একটা ফর্ম থাকতে হবে। কিন্তু এগুলো নেই। সে কারণে এই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’

একই মত প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদে তৃতীয় তপশিলে শপথের যে নমুনা রয়েছে, তার বাইরে আলাদা আদেশ দিয়ে নতুন শপথ সংযোজন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর ভাষায়, “কোনো আদেশ দিয়ে সংবিধানের বিধান পরিবর্তন করা যায় না।”

গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ তৌহিদ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোট ও ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত গেজেট স্থগিত ও বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে।

রিটে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার একটি সাংবিধানিক ট্রাস্টি হিসেবে সংবিধানের সীমার মধ্যে থাকতে বাধ্য। স্পষ্ট আইনগত কাঠামো, বিধিমালা ও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা ছাড়া গণভোট আয়োজন জনগণের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। রুল জারি করে গণভোট-২০২৬–এর ফল বাস্তবায়ন থেকে বিবাদীদের বিরত রাখার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়। এতে ৪৮টি প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৩০ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে। বাকি প্রস্তাবগুলোতে ভিন্নমত নথিভুক্ত রয়েছে। সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়, যার প্রথম ধাপে রাষ্ট্রপতি গত ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন।

গণভোট-পরবর্তী ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। তবে দ্বৈত শপথ ইস্যুতে সৃষ্ট আইনি জটিলতা এখন পুরো প্রক্রিয়াকেই অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন