জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)-এর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ, যার নেতৃত্বে ছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
একই সঙ্গে ১১ সদস্যের একটি আহ্বায়ক (এডহক) কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার সভাপতি হয়েছেন তামিম ইকবাল।
এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে, যেখানে বিসিবি নির্বাচন ২০২৫-এ ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে এসেছে।
বিসিবি নির্বাচন ২০২৫: তদন্ত প্রতিবেদন
১. জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা (ক্যাটেগরি-১) সংক্রান্ত অভিযোগ
তদন্ত কমিটি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও সরকারি হস্তক্ষেপের প্রমাণ পেয়েছে:
- সময়সীমা বৃদ্ধি: যথাযথ কারণ ছাড়াই গোপন উদ্দেশ্যে কাউন্সিলর মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার সময়সীমা একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়। কমিটির মতে, এটি করা হয়েছিল যাতে পূর্বে মনোনীতদের পরিবর্তন করে পছন্দের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
- সরকারি হস্তক্ষেপ ও চাপ: তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টার একান্ত সচিব সাইফুল ইসলাম এবং এনএসসি কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাউন্সিলর হিসেবে মনোনীত করতে জেলা প্রশাসকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন।
- অ্যাড হক কমিটির অপব্যবহার: অধিকাংশ অ্যাড হক কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মাধ্যমে নাম পাঠানো হয়। এছাড়া প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগে নিয়মবহির্ভূতভাবে অ্যাড হক কমিটির সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়।
- ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতার অভাব: নির্ধারিত সময়ে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি এবং তালিকার একাধিক সংস্করণে ভোটার সংখ্যা পরিবর্তন করে স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে।
২. মেট্রোপলিটন ক্লাব (ক্যাটেগরি-২) সংক্রান্ত অভিযোগ
মেট্রোপলিটন ক্লাবগুলোর নির্বাচনেও সুসংগঠিত কারচুপির চিত্র উঠে এসেছে:
- ভয়ভীতি ও জবরদস্তি: ক্লাব কাউন্সিলরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় তাদের হুমকি প্রদান ও বেআইনিভাবে জবরদস্তি করা হয়েছিল।
মনোনয়নে বিশেষ সুবিধা: ফারুক আহমেদকে সময়সীমার পরে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বেআইনি সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে কমিটি মনে করে।
ভোটদান পরিবেশ: সামগ্রিক পরিবেশ স্বাধীন ও ন্যায়সঙ্গত ছিল না এবং ভোটাররা সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ভোট দিতে বাধ্য হয়েছেন।
৩. ই-ভোটিং প্রক্রিয়া ও গোপনীয়তা লঙ্ঘন
ই-ভোটিং ব্যবস্থাটি নির্বাচনের ফলাফল নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়েছিল বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে:
- গোপনীয়তাহীন ভোট: ভোটারদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে (যেমন: হোটেল শেরাটন) জড়ো করে সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়, যা ব্যালটের গোপনীয়তা ও গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী।
স্বার্থের সংঘাত: ভোটগ্রহণের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হোটেলের স্টেক হোল্ডার ছিলেন বিসিবির বর্তমান সহ-সভাপতি মো.শাখাওয়াত]।
৪. সাবেক ক্রিকেটার মনোনয়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহার
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে:
- একাধিকবার ক্ষমতার লঙ্ঘন: বিসিবি সংবিধানের আর্টিকেল ৯৩.৩ অনুযায়ী সভাপতি এককভাবে ১০ জন প্রাক্তন ক্রিকেটারকে মনোনয়ন দিতে পারেন না, অথচ তিনি একপক্ষীয়ভাবে এই মনোনয়ন দিয়েছেন।
- প্রমাণ লুকানোর চেষ্টা: বোর্ড সভার অডিও বা ভিডিও রেকর্ড চাওয়া হলেও বিসিবি কর্তৃপক্ষ তা সরবরাহ করতে অস্বীকৃতি জানায়, যা তদন্ত কমিটি অসহযোগিতা হিসেবে গণ্য করেছে।
- পরিচালক পদে প্রভাব: আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও নাজমুল আবেদিন ফাহিমকে অ্যাড হক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল যাতে তারা পরিচালক পদে জয়ী হতে পারেন, যা গুরুতর ক্ষমতার অপব্যবহার।
৫. সাংবিধানিক ও আইনি দুর্বলতা
কমিটি দেখতে পেয়েছে যে বর্তমান বিসিবি সংবিধান ও নির্বাচন বিধিমালা ২০২৫ মৌলিকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ
- স্বতন্ত্র তত্ত্বাবধান ও ই-ভোটিংয়ের নিরাপত্তার জন্য সংবিধানে কোনো সুনির্দিষ্ট ধারা নেই।
- কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই অনিয়মগুলো করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

