রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

আতঙ্কের জনপদ বনানী-মহাখালী: সন্ত্রাসীদের উন্মুক্ত মহড়া, জিম্মি সাধারণ মানুষ

শাদিন সরকার | ঢাকা

শাদিন সরকার | ঢাকা

রাজধানীর অন্যতম অভিজাত এলাকা বনানী ও সংলগ্ন মহাখালী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের আনাগোনা, লাগামহীন চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং কিশোর গ্যাংয়ের উপদ্রবে জনজীবন বিপর্যস্ত। একের পর এক গোলাগুলি ও চুরির ঘটনায় সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে চরম আতঙ্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের জামিনে মুক্তি এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীরা এখন অপ্রতিরোধ্য। আমাদের প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

গত কয়েক মাসে এই এলাকায় বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। সম্প্রতি মহাখালী কাঁচাবাজার এলাকায় ৫-৬ জন সন্ত্রাসী রফিক নামক এক ব্যক্তির পায়ে গুলি করে বীরদর্পে পালিয়ে যায়। গত মাসে ক্যান্সার হাসপাতালের উপ-পরিচালককে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় ৫ জন ধরা পড়লেও নেপথ্যে উঠে এসেছে সরকারি কাজের ‘টেন্ডার’ সংক্রান্ত বিরোধ।

গত অক্টোবরে বৈশাখী টেলিভিশনের পাশের গলিতে হেলমেট পরে গুলি চালায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী আব্দুর রহমান মাসুম ওরফে মোল্লা মাসুম। গত ৭ মে সে পুবাইল থানায় ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হলেও তার বাহিনীর দাপট কমেনি। এছাড়া টিবি গেট এলাকায় মুখোশধারী সন্ত্রাসী জসিম পিস্তল ঠেকিয়ে ফার্মেসির ক্যাশ লুট করে। যদিও র‍্যাব তাকে গ্রেপ্তার করেছে, কিন্তু ওই এলাকায় ঠিকাদারদের লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা এখনো নিয়মিত।

অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের মূল লক্ষ্য এখন টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ। কয়েক মাস আগে বক্ষব্যাধি হাসপাতালের একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীকে টেন্ডার বিরোধের জেরে গুলি করে হত্যা করা হয়। একইভাবে গুলশান পুলিশ প্লাজার পাশের গলিতে সুমন নামে এক ডিস ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এমনকি গুলশানের একটি নার্সারিতেও চাঁদাবাজির জন্য গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। টিবি গেট এলাকায় স্বাস্থ্যের দুই ঠিকাদারকে উদ্দেশ্য করে গুলির ঘটনা ঘটেছে কিছুদিন আগে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বনানী ১ নম্বর রোডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, বনানী থানার কথিত সোর্স শহীদ মাতাল অবস্থায় কড়াইল বস্তির এক ব্যবসায়ীকে চাঁদার জন্য হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে, কড়াইল বস্তির চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান তার বাহিনী নিয়ে সাততলা বস্তির মাদক ব্যবসায়ী ফর্মা সোহেলকে কুপিয়ে জখম করার ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বেলতলা বস্তির বাসিন্দা জাহিদ জানান, সন্ত্রাসী নাডা রুবেল ও ইয়াসিন তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে। থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও রহস্যজনক কারণে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। মহাখালীতে এখন আরেক আতঙ্ক ভাগিনা শাকিল। যখন তখন ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে চাঁদা দাবি করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনানীর এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা এখন ঘর থেকে বের হতেই ভয় পাই। কখন কার পায়ে গুলি লাগে বা কার কাছে চাঁদা চেয়ে বসে তার কোনো ঠিক নেই। এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের যে দাপট, তাতে পরিবার নিয়ে শান্তিতে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

অবসরপ্রাপ্ত একজন উর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, “চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধে জড়াচ্ছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। যখন অপরাধীরা জানবে যে রাজনৈতিক পরিচয় তাদের বাঁচাতে পারবে না, তখনই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

এ বিষয়ে বনানী থানার একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা অপরাধীদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। কথিত সোর্স বা অপরাধীদের সাথে পুলিশের কোনো যোগসাজশ থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মহাখালী ও বনানী এলাকার অধিকাংশ অপরাধের মূলে রয়েছে টেন্ডারবাজি, ডিস ব্যবসা এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পুলিশি তৎপরতা দৃশ্যমান হলেও নেপথ্যের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় অপরাধের মাত্রা কমছে না।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন