দীর্ঘ কূটনৈতিক টানাপড়েন, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধ-এর উত্তেজনার মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প পৌঁছেছেন বেইজিং-এ। সেখানে তিনি শি জিন পিং-এর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসবেন।
১৪ ও ১৫ মে অনুষ্ঠিতব্য এ বৈঠককে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই অর্থনীতির এই আলোচনায় উঠে আসছে বাণিজ্য, তাইওয়ান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি-সহ সবচেয়ে স্পর্শকাতর বৈশ্বিক ইস্যুগুলো।
এটি ২০১৭ সালের পর ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের প্রথম সরাসরি বৈঠক। বিশ্লেষকদের মতে, এমন এক সময়ে এই বৈঠক হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন-এর সম্পর্ক সবচেয়ে জটিল অবস্থায় পৌঁছেছে।
বেইজিং যাওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ইরান ইস্যু আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তবে সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু থাকবে বাণিজ্য।
লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়-এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সালভাদর সান্তিনো রেগিলমে বলেন, “বাণিজ্য ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও আসল প্রতিযোগিতা হচ্ছে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য থাকবে চীনের কাছ থেকে দৃশ্যমান বাণিজ্যিক ছাড় আদায় করা। বিশেষ করে বোয়িং (Boeing) উড়োজাহাজ, গরুর মাংস ও সয়াবিন রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়ে চীনের প্রতিশ্রুতি পেতে চাইছে ওয়াশিংটন।
অন্যদিকে বেইজিংয়ের মূল অগ্রাধিকার হলো উন্নত অর্ধপরিবাহী চিপ ও চিপ তৈরির প্রযুক্তির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করানো।
তাইওয়ান ইস্যুও বৈঠকের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন তাইওয়ানের চারপাশে সামরিক মহড়া ও নৌ টহল বাড়িয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের আত্মরক্ষায় সামরিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
বিশেষ করে উইলিয়াম লাই চিংতে ক্ষমতায় আসার পর দুই পক্ষের উত্তেজনা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এছাড়া প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও দ্বন্দ্ব এখন তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে চীনের কাছে উন্নত চিপ ও চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি রপ্তানিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, চীনের সামরিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সক্ষমতা ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ।
অন্যদিকে বিশ্বে ব্যবহৃত বিরল খনিজ পরিশোধনের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। এসব খনিজ বৈদ্যুতিক গাড়ি, চিপ, সামরিক সরঞ্জাম ও ইলেকট্রনিক পণ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীনও পাল্টা গুরুত্বপূর্ণ কিছু খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি হবে ইরান যুদ্ধ। কারণ চীন এখন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্টিমসন সেন্টার-এর নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড্যান গ্রাজিয়ের বলেন, ট্রাম্প চেষ্টা করবেন শি জিনপিংকে দিয়ে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করাতে, যাতে তেহরান আবার আলোচনায় ফিরে আসে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা কম হলেও সীমিত কিছু সমঝোতা হতে পারে। এর মধ্যে শুল্ক সাময়িক স্থগিত, বিরল খনিজ রপ্তানি, কৃষিপণ্য আমদানি বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো তৈরি থাকতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল প্রতিযোগিতা থেকেই যাবে। কারণ দুই অর্থনীতি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হলেও উভয় দেশই এখন সেই নির্ভরতাকে কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।

