জেন-জি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রজন্ম। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এ প্রজন্মকে একসময় বলা হতো স্ক্রিননির্ভর প্রজন্ম। অনেকেই মনে করতেন, তারা বাস্তবতার চেয়ে ভার্চুয়াল জগতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু সময়ের বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সেই ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
প্রতিটি যুগের ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়, পরিবর্তনের সূচনা করেছেন তরুণরাই। ইসলামও যুবসমাজকে কেবল ভবিষ্যতের নাগরিক নয়, বরং পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে দেখেছে। ইসলামের প্রথম যুগে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর আহ্বানে যাঁরা সবচেয়ে দ্রুত সাড়া দিয়েছিলেন, তাঁদের বড় একটি অংশ ছিলেন যুবক। হজরত আলী (রা.), হজরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.), হজরত উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) এবং হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তাঁদের জীবন প্রমাণ করে, আদর্শবান যুবকরাই ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
পবিত্র কোরআনে গুহাবাসী যুবকদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, তারা ছিল কয়েকজন যুবক, যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল, আর আমি তাদের হিদায়াত আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম। (সুরা আল-কাহফ, আয়াত: ১৩)
এই আয়াত শুধু অতীতের একটি ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং প্রতিটি যুগের তরুণদের জন্য একটি বার্তা। ঈমান, আদর্শ ও সত্যের ওপর অবিচল থাকলে আল্লাহ নিজেই তাদের পথপ্রদর্শক হন।
আজকের জেন-জির সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, দ্রুত শেখার মানসিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সাহস। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তির অপব্যবহার, নৈতিক বিভ্রান্তি, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং পরিচয়ের সংকট। তথ্যের বিস্ফোরণের এই যুগে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দুর্যোগে তরুণদের স্বেচ্ছাসেবামূলক অংশগ্রহণ, রক্তদান কর্মসূচি, পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রম প্রমাণ করে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে জেন-জি কেবল পরিবর্তনের দর্শক নয়, বরং পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিতেও সক্ষম। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে তরুণদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেশ-বিদেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এটি প্রমাণ করেছে, সঠিক লক্ষ্য ও নেতৃত্ব পেলে তরুণরা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সক্ষম। ইসলামের দৃষ্টিতে, যেকোনো পরিবর্তনের প্রচেষ্টা হতে হবে ন্যায়, সত্য, প্রজ্ঞা ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের মর্যাদা সম্পর্কে এমন একটি সুসংবাদ দিয়েছেন, যা প্রতিটি তরুণের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালাতে পারে। তিনি বলেন, সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন। তাদের একজন হলো সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬০)
এ হাদিসের শিক্ষা হলো, একজন যুবকের প্রকৃত পরিচয় তার অনুসারীর সংখ্যা, জনপ্রিয়তা বা বাহ্যিক সাফল্যে নয়, বরং তার ঈমান, চরিত্র ও আল্লাহর আনুগত্যে। ইসলাম এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়, যারা সত্যবাদী, আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ ও মানবকল্যাণে নিবেদিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,
নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন, আর অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। (সুরা আন-নাহল, আয়াত: ৯০)
অতএব, আজকের তরুণরা যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, মানুষের সেবায় এগিয়ে আসে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে, তবে সেটিই হবে ইসলামের প্রকৃত চেতনার বাস্তব প্রতিফলন। তোমাদের মধ্য থেকে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখবে। তারাই সফলকাম। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৪)
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। কোনো সামাজিক পরিবর্তন তখনই স্থায়ী হয়, যখন তার ভিত্তি হয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধ। বাহ্যিক পরিবর্তনের চেয়ে চরিত্রের পরিবর্তন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রকে পূর্ণতা দান করার জন্য। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮৯৫২)
আজ আমাদের দায়িত্ব জেন-জিকে সমালোচনা করা নয়, বরং তাদের সম্ভাবনাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। তাদের হাতে রয়েছে প্রযুক্তি, জ্ঞান অর্জনের অসীম সুযোগ এবং নতুন পৃথিবী গড়ার শক্তি। প্রয়োজন শুধু কোরআনের আলো, সুন্নাহর দিকনির্দেশনা এবং সৎ নেতৃত্বের।
আজকের জেন-জির হাতে যেমন প্রযুক্তির শক্তি রয়েছে, তেমনি তাদের হৃদয়ে যদি কোরআনের আলো, সুন্নাহর আদর্শ এবং উত্তম চরিত্রের শিক্ষা প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তারাই আগামী দিনের মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণের নেতৃত্ব দেবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, একটি আদর্শবান যুবসমাজই একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
ইমাম হাসান আল বাসরী (রহ.) এর একটি বিখ্যাত উক্তি এ প্রসঙ্গে গভীর তাৎপর্য বহন করে, হে আদমসন্তান! তুমি মূলত কতগুলো দিনের সমষ্টি। প্রতিটি দিন অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার একটি অংশও চলে যাচ্ছে।
এই উপলব্ধিই একজন তরুণকে সময়ের মূল্য শেখায়, আর সময়ের সঠিক ব্যবহারই গড়ে তোলে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম। আজ প্রয়োজন নতুন প্রজন্মকে সমালোচনা নয়, সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া। তাদের হাতে রয়েছে প্রযুক্তির শক্তি, জ্ঞান অর্জনের অসীম সুযোগ এবং সমাজ পরিবর্তনের সাহস। এই শক্তি যদি কোরআনের আলো, সুন্নাহর আদর্শ ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষায় পরিচালিত হয়, তবে তারাই আগামী দিনের ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের নেতৃত্ব দিতে পারবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রতিটি নবজাগরণের কেন্দ্রেই ছিল একদল আদর্শবান তরুণ।

