রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

পরিবেশ রক্ষায় নতুন সমাধান, আসছে হাইড্রোজেন ট্রেন

নিউজ ডেস্ক

জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদূষণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে বিশ্বজুড়ে পরিবহন খাতে চলছে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। সড়কে বৈদ্যুতিক যানবাহনের পাশাপাশি রেলপথেও যুক্ত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি। এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন হলো হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন, যা ভবিষ্যতের টেকসই রেল পরিবহনের অন্যতম সম্ভাবনাময় মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কী এই হাইড্রোজেন ট্রেন?

হাইড্রোজেন ট্রেন এমন একটি আধুনিক রেলযান, যা ডিজেল বা কয়লার পরিবর্তে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলে। ফুয়েল সেলের ভেতরে হাইড্রোজেন ও বাতাসের অক্সিজেনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় বিদ্যুৎ তৈরি হয়, যা ট্রেনের বৈদ্যুতিক মোটর পরিচালনা করে।

এই প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড, ধোঁয়া বা ক্ষতিকর গ্যাস প্রায় নির্গত হয় না। বরং উপজাত হিসেবে তৈরি হয় পানি ও জলীয় বাষ্প। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব এবং কম দূষণকারী প্রযুক্তি হিসেবে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে।

কীভাবে পরিচালিত হয়?

হাইড্রোজেন ট্রেনে উচ্চচাপের বিশেষ ট্যাংকে হাইড্রোজেন গ্যাস সংরক্ষণ করা হয়। চলার সময় সেই গ্যাস ফুয়েল সেলে প্রবেশ করে অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটায় এবং বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ মোটরে সরবরাহ করা হয়, আর অতিরিক্ত শক্তি ব্যাটারিতে জমা থাকে।

ব্রেক করার সময় উৎপন্ন শক্তিও পুনরায় ব্যাটারিতে সংরক্ষিত হয়, ফলে শক্তির অপচয় কমে এবং জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অগ্রগতি

হাইড্রোজেন ট্রেন প্রযুক্তির বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় জার্মানিতে। ২০১৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালনার পর ২০২২ সালে দেশটি নিয়মিত যাত্রীবাহী হাইড্রোজেন ট্রেন চালু করে।

এরপর ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও নিজস্ব প্রযুক্তিতে হাইড্রোজেন ট্রেনের উন্নয়ন ও পরীক্ষামূলক পরিচালনা শুরু করেছে।

দক্ষিণ এশিয়াতেও প্রযুক্তিটির যাত্রা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ভারত দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত প্রথম হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন উদ্বোধন করে, যা এ অঞ্চলে পরিচ্ছন্ন রেল প্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

কেন বাড়ছে জনপ্রিয়তা?

বিশ্বের বহু রেলপথ এখনো বিদ্যুতায়িত নয়। এসব রুটে বৈদ্যুতিক ট্রেন চালাতে বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন বিদ্যমান রেললাইনেই চলতে পারে এবং আলাদা ওভারহেড বিদ্যুৎ লাইনের প্রয়োজন হয় না।

দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম, দ্রুত জ্বালানি ভরা এবং নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের সুবিধাও এই প্রযুক্তিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

প্রধান সুবিধা

  • প্রায় শূন্য কার্বন নিঃসরণ
  • বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ কম
  • দীর্ঘ দূরত্বে কার্যকর চলাচল
  • দ্রুত রিফুয়েলিং সুবিধা
  • জ্বালানি ব্যবহারে উচ্চ দক্ষতা
  • ভবিষ্যতে গ্রিন হাইড্রোজেন ব্যবহারের মাধ্যমে আরও পরিবেশবান্ধব হওয়ার সম্ভাবনা

যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে

সম্ভাবনা থাকলেও প্রযুক্তিটির সামনে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের ব্যয় এখনো তুলনামূলক বেশি। এছাড়া হাইড্রোজেন সংরক্ষণ, পরিবহন ও সরবরাহের জন্য বিশেষ অবকাঠামো প্রয়োজন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনবল তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

তবে প্রযুক্তির অগ্রগতি ও উৎপাদন ব্যয় কমার সঙ্গে সঙ্গে এসব বাধা ধীরে ধীরে দূর হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা

বাংলাদেশ রেলওয়ে নতুন রেললাইন নির্মাণ, ডাবল লাইন সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুতায়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এমন পরিস্থিতিতে যেসব রুটে বিদ্যুতায়ন ব্যয়বহুল, সেখানে দীর্ঘমেয়াদে হাইড্রোজেন ট্রেন কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং আধুনিক রেলব্যবস্থা গড়ে তুলতেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর জন্য গবেষণা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

ভবিষ্যতের রেল প্রযুক্তি

বিশ্ব যখন কার্বন নিরপেক্ষ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন হাইড্রোজেনকে ভবিষ্যতের অন্যতম পরিচ্ছন্ন জ্বালানি হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের সহজলভ্যতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগামী বছরগুলোতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাইড্রোজেনচালিত ট্রেনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের পথে এটি হতে পারে রেল পরিবহনের এক নতুন মাইলফলক।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন