বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Logo

স্বস্তি মিলছে না গ্যাস সংকটে, ভোগান্তি অব্যাহত

নিউজ ডেস্ক

কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত ২১ জুলাইয়ের ওই ঘটনার পর টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। মেরামতকাজ শুরু হলেও চলতি মাসে টার্মিনালটি পুনরায় চালুর সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পুনঃবাষ্পীভবন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য বর্তমানে দুটি ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) রয়েছে। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। তবে একটি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, টার্মিনালের বয়লার থেকে বের হওয়া সিগন্যালবাহী বৈদ্যুতিক তারে শর্টসার্কিটের কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে বিদেশি প্রকৌশলীরা কাজ শুরু করেছেন। তবে চলতি সপ্তাহে টার্মিনালটির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার সম্ভাবনা নেই।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে আগে সরবরাহ করা হতো প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ আসত প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দৈনিক সরবরাহ কমে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।

ফলে চাহিদার বিপরীতে গ্যাস ঘাটতি বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন খাতে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। মেরামতকাজ চলমান থাকলেও চলতি মাসের মধ্যে টার্মিনালটি চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে আরও কিছু সময় লাগবে।

আবাসিকে চরম দুর্ভোগ

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ এত কম যে রান্নার কাজ শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগছে।

মগবাজারের বাসিন্দা পারভীন বলেন, দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। কখনো রাতে গ্যাস এলে তখন রান্নার কাজ শেষ করতে হয়।

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. সুমন বলেন, গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্না বসানোর পরও এক ঘণ্টায় কাজ শেষ হয় না। এতে পরিবারের খাবার প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে অনেক গ্রাহক সিলিন্ডার ও ইনডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করেছেন। তবে এতে তাদের অতিরিক্ত খরচ বাড়ছে। আবাসিক গ্যাসের বিল দেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানির পেছনেও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, তিতাসের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট। এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটে। টার্মিনালটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত এ ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ায় দৈনিক ট্রিপ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।

মগবাজারের একটি সিএনজি স্টেশনে গ্যাস নিতে অপেক্ষারত চালক মো. আল আমিন বলেন, এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরেও অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ কম থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী নেওয়া যাচ্ছে না।

আরেক চালক মো. কাউছার বলেন, দৈনিক চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ট্রিপ কমে যাচ্ছে এবং আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানি করা জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা দেশের গ্যাস সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইন বলেন, দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎসে অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর বিকল্প নেই। দেশে গ্যাসের সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদনে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আরও আগে শুরু করা হলে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারত।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন