রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬
Logo

যেভাবে নিরাপত্তা বলয় ভেঙে জিয়াউর রহমানের কক্ষে ঢুকেছিল হত্যাকারীরা

নিউজ ডেস্ক

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর প্রকাশ্যে এসেছে সেই সময় গঠিত তদন্ত কমিশনের অপ্রকাশিত প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ইউসুফ মো. মাহফুজুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির এইড-ডি-ক্যাম্প (এডিসি) ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক এবং তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমানের কর্মকাণ্ড নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহ পর, ৬ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার এ ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেন। তবে কমিশনের প্রতিবেদনটি দীর্ঘদিন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি।

সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনের একটি মুদ্রিত কপি হাতে পাওয়ার দাবি করে এর বিস্তারিত প্রকাশ করেছে গণমাধ্যম দ্য ডেইলি স্টার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত স্টাফদের একজন বা একাধিক সদস্যের ভূমিকার কারণে তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়ে থাকতে পারে বলে কমিশনের কাছে বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ ছিল।

ঘটনার রাতে রাষ্ট্রপতির কক্ষের পূর্ব পাশের একটি কক্ষে অবস্থান করছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান। কমিশনকে দেওয়া বক্তব্যে ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক জানান, গোলাগুলি পুরোপুরি থেমে যাওয়ার পর তিনি কক্ষ থেকে বের হন। পরে রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে যাওয়ার সময় তিনি মাহফুজুর রহমানকে বারান্দার অন্য পাশ থেকে আসতে দেখেন।

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহফুজুর রহমান তাকে জানান, ‘সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’ পরে তারা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কক্ষের সামনে রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় দেখতে পান। গুলিতে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এএফএম মইনুল আহসান এবং প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানও ওই হামলায় নিহত হন।

মাহফুজুর রহমানকে ঘিরে প্রশ্ন

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার সময় কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিজেদের কক্ষের দরজা খুলেছিলেন—এমন অভিযোগ ছিল। অন্য দুই কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই নিহত হলেও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান কীভাবে কোনো গুরুতর আঘাত ছাড়াই বেঁচে যান, তা নিয়ে কমিশন প্রশ্ন তুলেছে।

মাহফুজুর রহমানের কক্ষের দেয়ালে থাকা গুলির চিহ্নও পরীক্ষা করে কমিশন। তিনি দাবি করেছিলেন, কক্ষের বাইরে থেকে ছোড়া গুলিতে ওই চিহ্ন তৈরি হয়েছিল। তবে পুলিশের বিশেষজ্ঞ মতামত পর্যালোচনার পর কমিশনের কাছে এ দাবি অসম্ভব বলে মনে হয়। গুলির চিহ্নগুলোর অবস্থান ও ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশন বলেছে, সেগুলো পরে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মাহফুজুর রহমান ও ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক কেউই গোলাগুলির সময় নিজেদের কক্ষ থেকে বের হননি। হামলাকারীরা চলে যাওয়ার অনেক পরে একজন ওয়্যারলেস অপারেটর তাদের বাইরে আসতে বলেন।

কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ওই দুই কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় নিজেদের কক্ষে টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এবং রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছানোর কোনো কার্যকর চেষ্টা করেননি। রাষ্ট্রপতির প্রতি তাদের দায়িত্ব ও আনুগত্য বিবেচনায় এ আচরণ প্রত্যাশিত ছিল না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সংযোগ দরজা খুলতে চেষ্টা করেননি এডিসি

প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের কক্ষের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কক্ষের একটি সংযোগ দরজা ছিল। কিন্তু গোলাগুলির সময় তিনি সেটি খোলার চেষ্টা করেননি।

কমিশনের মতে, ওই সংযোগ দরজা ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছানো কিংবা তাকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করা এডিসির জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হতে পারত। দরজাটি অন্য পাশ থেকে বন্ধ থাকলেও সেটিতে আঘাত করে রাষ্ট্রপতিকে সতর্ক করার চেষ্টা করা উচিত ছিল বলে কমিশন মনে করেছে।

তবে ক্যাপ্টেন মাজহারুল হক কমিশনকে জানান, রাষ্ট্রপতির কক্ষের সঙ্গে তার কক্ষের সংযোগ দরজা থাকার বিষয়টি তিনি জানতেন না।

রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে থেকে সরানো হয় প্রহরী

তদন্তে আরও উঠে আসে, ঘটনার রাতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহফুজুর রহমান রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে দায়িত্ব পালনরত দুই হাউস গার্ডকে সরিয়ে নিতে বলেন। হাউস গার্ডের দায়িত্বে থাকা ইন্সপেক্টর বজলুর রশিদ কমিশনকে জানান, রাত ১০টার দিকে মাহফুজুর রহমান তাকে ওই দুই প্রহরী সরানোর নির্দেশ দেন।

এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, প্রহরীদের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির অসুবিধা হচ্ছিল। ফলে হামলার সময় রাষ্ট্রপতির কক্ষের বাইরে কোনো প্রহরী ছিল না।

কমিশন আরও উল্লেখ করে, ঘটনার দিন সকালে মাহফুজুর রহমান সার্কিট হাউসের কোন কক্ষে কে অবস্থান করছেন, তার একটি টাইপ করা তালিকা চান। এর আগে রাষ্ট্রপতি সার্কিট হাউসে অবস্থান করলেও তিনি কখনো এমন তালিকা চেয়েছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়নি।

মরদেহ সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন

হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ নিরাপদ রাখতে যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। কিছুক্ষণ পর বিদ্রোহী সেনাদের একটি দল মরদেহ নিয়ে যায় এবং অজ্ঞাত স্থানে দাফন করে। পরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় সেই স্থান শনাক্ত করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহফুজুর রহমান সেনা সদর দপ্তরে বার্তা পাঠিয়ে রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঢাকায় নিতে সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে একটি হেলিকপ্টার পাঠানোর অনুরোধ করেন। কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছিল, মরদেহ ঢাকায় নেওয়ার জন্য ওই কর্মকর্তাদের উপস্থিতি প্রয়োজন ছিল না এবং স্থানীয় বিমান বাহিনী ঘাঁটি থেকেও হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল।

কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহফুজুর রহমানের কাছে যোগাযোগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেনা সদর দপ্তরের সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ বা নির্দেশনা চাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মেজর মুজিবের উপস্থিতি নিয়েও সন্দেহ

তদন্ত প্রতিবেদনে ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের স্থানীয় কর্মকর্তা মেজর মুজিবুর রহমানের সার্কিট হাউস পরিদর্শনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ঘটনার আগে দিনের বেলায় তিনি সার্কিট হাউসে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

কমিশনের মতে, সেখানে তার উপস্থিতির কোনো সুস্পষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই সফর কোনো গোপন উদ্দেশ্যে পরিচালিত রেকি বা তথ্য সংগ্রহের অংশ ছিল কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

তবে সার্কিট হাউসে মেজর মুজিবের ওই সফরকে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মকর্তা বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুরুত্ব দেয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৬২ জনের সাক্ষ্য নেয় তদন্ত কমিশন

সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশনের অন্য সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল এবং খুলনার তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দিন আহমেদ।

তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ মোট ৬২ জনের সাক্ষ্য নেয় কমিশন।

তদন্তের সারসংক্ষেপে কমিশন বলেছে, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাব্যবস্থা এতটাই দুর্বল ও শিথিল ছিল যে সার্কিট হাউসে ব্যাপক অস্ত্রসজ্জা থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীরা প্রায় বাধাহীনভাবে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়।

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যত কোনো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। পুরো ঘটনাটি যেন তাদের জন্য ছিল ‘ভিনি, ভিডি, ভিচি’—অর্থাৎ ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’।

উল্লেখ্য, তদন্ত প্রতিবেদনে উত্থাপিত পর্যবেক্ষণ ও সন্দেহগুলো কমিশনের অনুসন্ধানভিত্তিক। এগুলোকে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন