বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Logo

রূপপুরের অর্থ পরিশোধে রুপির প্রস্তাব, বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কে নতুন মোড়

নিউজ ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনে তৈরি হওয়া জটিলতা কাটাতে বাংলাদেশকে ভারতীয় রুপিতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে পৃথক পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ঢাকায় একটি রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর বিষয়টিও আবার সামনে এনেছে দেশটি।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-রাশিয়া বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাজনিত আর্থিক জটিলতা মোকাবিলায় বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ উদ্যোগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং ঝুঁকি, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত থাকায় বাংলাদেশকে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। বৈঠকের আগে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা চলছে।

কেন ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্যের প্রস্তাব?

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর একাধিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে রাশিয়ার ব্যাংকিং ও আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনব্যবস্থা। প্রচলিত আর্থিক চ্যানেলে বাধা তৈরি হওয়ায় রাশিয়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে স্থানীয় বা বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।

ভারত, চীন ও তুরস্কসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে মস্কো। এবার বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কাঠামো চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

রাশিয়ার প্রস্তাব অনুযায়ী, দুই দেশের আমদানি-রপ্তানির অর্থ ভারতীয় রুপিতে নিষ্পত্তি করা হতে পারে। পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথাও বলা হয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রচলিত ব্যাংকিং চ্যানেলে তৈরি হওয়া বাধা কিছুটা কমানো যায়।

রূপপুর প্রকল্পের অর্থ পরিশোধে জটিলতা

রাশিয়ার প্রস্তাবের পেছনে অন্যতম বড় কারণ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ঋণ পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতা।

রাশিয়ার অর্থায়নে নির্মাণাধীন প্রকল্পটির ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময় বাংলাদেশ সমস্যার মুখে পড়ে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ ব্যাংকগুলোর কাছে প্রচলিত ব্যবস্থায় অর্থ পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় অর্থ পরিশোধের বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে।

শুরুতে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে অর্থ পরিশোধের একটি বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হলেও সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা-ঝুঁকির কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো এতে আগ্রহ দেখায়নি।

বর্তমানে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার নামে খোলা একটি হিসাবে ঋণের কিস্তির অর্থ জমা রাখা হচ্ছে। তবে সেই অর্থ এখনো রাশিয়ায় স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। ফলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের আর্থিক দায় নিষ্পত্তির বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।

বাংলাদেশ এর আগে ওই অর্থ দেশের ভেতরে বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পে ব্যবহারের প্রস্তাব দিলেও রাশিয়া তাতে সম্মত হয়নি।

আবারও রুশ ব্যাংকের শাখা খোলার প্রস্তাব

বাংলাদেশে একটি রুশ ব্যাংকের শাখা স্থাপনের প্রস্তাব নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও মস্কো একই উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতামত চাইলেও শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি আর এগোয়নি।

এবার আবারও রুশ ব্যাংকের শাখা চালুর বিষয়টি সামনে এনেছে মস্কো। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে রুশ ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হলে দুই দেশের মধ্যে অর্থ লেনদেন সহজ হতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, আর্থিক ঝুঁকি এবং বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন রোডম্যাপ

আর্থিক লেনদেনের পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতেও একগুচ্ছ প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বাংলাদেশ-রাশিয়া বিজনেস কাউন্সিল গঠন
  • রাশিয়ার বাজারের জন্য নিবন্ধিত বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকের তালিকা তৈরি
  • ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি
  • বাংলাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে সহায়তা
  • বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণ

রাশিয়ার মূল্যায়ন, রাজনৈতিক সম্পর্কের তুলনায় বাংলাদেশ ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

যুদ্ধের পর কমেছে রপ্তানি

রাশিয়া বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় রপ্তানি বাজার হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় বছরে ৫০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হতো। তবে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে রাশিয়ায় প্রায় ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো রাশিয়া থেকে গম, সারসহ বিভিন্ন কৌশলগত পণ্য আমদানি করছে।

বাংলাদেশের অগ্রাধিকার

আসন্ন বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ কয়েকটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • প্রযুক্তি হস্তান্তর
  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি
  • বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উন্নয়ন
  • ডিজিটাল অর্থনীতি ও ই-কমার্স
  • কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা
  • কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প
  • কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা
  • দক্ষতা উন্নয়ন
  • কানেক্টিভিটি ও লজিস্টিকস

ইআরডির কর্মকর্তাদের মতে, বৈঠকটি শুধু বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেই নয়, দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

কম দামে ইউরিয়া সার দিতে আগ্রহী রাশিয়া

দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদারের অংশ হিসেবে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার সরবরাহের আগ্রহ দেখিয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়ার প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় প্রতি টনে ১০ ডলার কম দামে এই সার সরবরাহ করা হতে পারে।

এ ছাড়া সূর্যমুখী তেল, গম, মিউরিয়েট অব পটাশ (এমওপি), হলুদ মটরশুঁটি, ছোলা, লাল মসুর ও সবুজ মসুর ডালের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির রাশিয়ার এই আগ্রহকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ভিত্তিতে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সুযোগের পাশাপাশি রয়েছে চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য চালু হলে বাংলাদেশ-রাশিয়া বাণিজ্যে অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কিছুটা কাটতে পারে। বিশেষ করে রূপপুর প্রকল্পের ঋণের অর্থ পরিশোধে বিকল্প পথ তৈরির সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

তবে বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নও জড়িত।

ফলে বাংলাদেশকে এমন একটি কাঠামো বেছে নিতে হবে, যা একদিকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে দেশের সম্পর্ক এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাও বজায় রাখবে।

আসন্ন বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তঃসরকার কমিশনের বৈঠক তাই শুধু একটি নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়; বরং নিষেধাজ্ঞার নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতায় দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তার গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করতে পারে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন