বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে ঢাকা ও নয়াদিল্লি। বাংলাদেশে ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাতের পর এ কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
বুধবার (২৯ জুলাই) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারস্পরিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে এটি ছিল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ। তাই কোনো নির্দিষ্ট দ্বিপক্ষীয় ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। বরং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অগ্রগতি ও সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়নি। ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে আলোচনা করার যথেষ্ট সুযোগ থাকবে।’
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কিছু ‘অস্বস্তিকর বিষয়’ বা ইরিট্যান্টস রয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও কার্যকর ও ইতিবাচক করতে এসব বিষয় নিরসন করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ভারতীয় হাইকমিশনার এসব বিষয়ে অবগত এবং বাংলাদেশও বিষয়গুলো সম্পর্কে জানে। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়েই আলোচনা হবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ বৈঠকে উঠেছিল কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ড. খলিলুর রহমান বলেন, সৌজন্য সাক্ষাতে কোনো নির্দিষ্ট দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি।
ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়টি পর্যালোচনায়
ভারতের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগামী ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার বর্তমানে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে তা দ্রুত গণমাধ্যমকে জানানো হবে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর সামনে আরও কয়েকটি বিদেশ সফরের আমন্ত্রণ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও অংশ নেবেন। ফলে সব সফর ও কর্মসূচি একসঙ্গে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের ঢাকা সফর ‘অনুসন্ধানমূলক’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গরের সম্ভাব্য ঢাকা সফরকে ‘অনুসন্ধানমূলক’ বা এক্সপ্লোরেটরি হিসেবে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সফরকালে সার্জিও গর বাংলাদেশ, দেশের অগ্রাধিকার এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধারণা নেবেন। তিনি শুধু সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গেই নয়, বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গেও কথা বলবেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত রোহিঙ্গা শিবিরও পরিদর্শন করতে পারেন। রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সহায়তাদাতা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্ককে বহুমাত্রিক আখ্যা দিয়ে ড. খলিলুর রহমান বলেন, উভয় দেশই এ অংশীদারত্ব আরও এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
বাংলাদেশ কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার কোনো ধরনের চাপ অনুভব করছে না।
চীনসহ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জাতীয় স্বার্থে
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কারণ হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কূটনীতিকে ‘জিরো-সাম গেম’ হিসেবে দেখা সঠিক নয়।
তিনি বলেন, একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার অর্থ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করা নয়। বাংলাদেশ কখনোই একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে গিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।
জাতীয় স্বার্থ ও দেশের অগ্রগতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায় বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে অত্যন্ত সফল উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভারত সফর হলেও বাংলাদেশ একই ধরনের ইতিবাচক ফল প্রত্যাশা করে।
তিনি বলেন, একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত হওয়া মানেই অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়া নয়। জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখবে।
সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার আশা ভারতীয় হাইকমিশনারের
ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার বৈঠক খুবই ভালো হয়েছে।
পারস্পরিক স্বার্থ এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন, সংস্কৃতি, সংগীত ও ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এটি কেবল শুরু এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আরও বেশি সম্পৃক্ততা তৈরি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ভারতীয় হাইকমিশনার।

