বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Logo

আড়তকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির বড় কারণ: সিপিডি

নিউজ ডেস্ক

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ আড়তকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থা। নগর এলাকার আড়তদারদের মাধ্যমে খাদ্যপণ্যের বড় অংশ সরবরাহ হওয়ায় বাজারে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ তৈরি হচ্ছে। এতে দরকষাকষির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি প্রতিযোগিতা কমছে এবং সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন, মজুতদারি বা ব্যবসায়ীদের যোগসাজশও দ্রুত খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিবেদনে দেশের খাদ্যপণ্যের বাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন পর্যায়ের মূল্য ব্যবধান নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।

গবেষণায় চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম, রুই মাছ, ব্রয়লার মুরগি ও গরুর মাংস—এই ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল, উৎপাদন ব্যয়, বিপণন ব্যয়, মূল্য সংযোজন এবং বাজারের বিভিন্ন স্তরের মুনাফা বা মার্জিন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্লেষণ করা ১০টি পণ্যের মধ্যে ছয়টির ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা প্রধানত নগর আড়তদারদের কাছ থেকেই পণ্য সংগ্রহ করেন। এসব পণ্য হলো—পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম ও রুই মাছ।

এর ফলে কয়েকটি নির্দিষ্ট আড়ত বা সরবরাহকারীর ওপর বাজারের অতিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দামের ওপর অল্পসংখ্যক ব্যবসায়ীর প্রভাব বাড়ছে। সরবরাহ ব্যবস্থার এ পর্যায়ে কোনো ধরনের বিঘ্ন, মজুতদারি বা ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগসাজশ হলে তার প্রভাব সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পড়ছে।

দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে বাড়ছে দাম

সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, সরবরাহ শৃঙ্খল যত দীর্ঘ, উৎপাদক বা খামার পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পণ্যের দাম বৃদ্ধির হারও তত বেশি।

বিশ্লেষণ করা পণ্যগুলোর মধ্যে কাঁচামরিচে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি—১১৬ শতাংশ। মাঝারি পাইজাম চালে মূল্যবৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশ।

এ ছাড়া দেশি পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, ডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

অন্যদিকে ডিম, ব্রয়লার মুরগি, গরুর মাংস ও রুই মাছের মতো তুলনামূলক কম স্তরবিশিষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খলের পণ্যে মূল্যবৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।

মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরবরাহ সংকট

খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের প্রধান কারণ হিসেবে সরবরাহ সংকটকে চিহ্নিত করা হয়েছে গবেষণায়। এর পরেই রয়েছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগসাজশ ও মজুতদারি।

তবে বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরের ব্যবসায়ী পরবর্তী স্তরের ব্যবসায়ীদের দায়ী করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বাজার ব্যবস্থায় সাত সুপারিশ

খাদ্যপণ্যের বাজার আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সাতটি সুপারিশ দিয়েছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে—

  • সরবরাহ শৃঙ্খলের অপ্রয়োজনীয় স্তর কমানো
  • পাইকারি বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো
  • কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বিকল্প ক্রেতা ও সরবরাহকারী তৈরি
  • উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের দাম নিয়মিত প্রকাশ
  • বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
  • আধুনিক সংরক্ষণ ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা
  • কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া

এ ছাড়া কাঁচামরিচের বাজারে অপ্রয়োজনীয় আড়তদার স্তর কমানো, পেঁয়াজে মজুতদারি কঠোরভাবে নজরদারি করা এবং আলুর জন্য বিকল্প বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।

ডিম ও ব্রয়লার মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণে পশুখাদ্য ও টিকার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

সিপিডির মতে, সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক করা গেলে খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কমানো এবং ভোক্তাদের জন্য তুলনামূলক স্থিতিশীল দাম নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

সম্পাদক :  এম ছাইফুল ইসলাম | কপিরাইট © সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন