নয়দিন পেরিয়ে গেলেও মহেশখালীতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল সচল হয়নি। ফলে দেশের গ্যাস সরবরাহ এখন প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করছে দেশীয় সামিট গ্রুপ পরিচালিত অপর টার্মিনালের ওপর। এতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
গ্যাসের সংকটে বাসাবাড়ির চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ভারী ও গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন কমে গেছে বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস না পাওয়ায় বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।
কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল দ্রুত সচল না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। শুরুতে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে টার্মিনালটি মেরামত করে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে বলে জানানো হলেও নয়দিনেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে টার্মিনালটি মেরামত ও পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো কর্মকর্তা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সর্বশেষ তথ্য পাওয়া পর্যন্ত এক্সিলারেট টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে।
তার ভাষ্য, আগামী সোমবার নাগাদ টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হতে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রথমে এর মোট সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করার লক্ষ্য রয়েছে।
মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল
কক্সবাজারের মহেশখালীর সাগরে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি এবং অন্যটি পরিচালনা করে দেশীয় সামিট গ্রুপ।
তবে এ দুটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি এলএনজি আমদানি করে না। সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট—এই দুই উৎস থেকে এলএনজি আমদানি করে।
জাহাজে করে এলএনজি মহেশখালীতে পৌঁছানোর পর ভাসমান টার্মিনালগুলোতে তা পুনর্গ্যাসীকরণ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটির দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই এলএনজি বহনকারী জাহাজ থেকে ভাসমান টার্মিনালে গ্যাস স্থানান্তরের সময় বয়লার এলাকায় আগুন লাগে।
ঘটনার প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে এলএনজি বহনকারী জাহাজটি টার্মিনাল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। তবে ঘটনার পর থেকেই ওই টার্মিনালের মাধ্যমে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
সরবরাহ সক্ষমতা নেমেছে ৪৭ শতাংশে
পাশে থাকা সামিট এলএনজি টার্মিনালের দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট। এক্সিলারেট টার্মিনাল বন্ধ হওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে সামিট টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়িয়ে প্রায় ৫৭ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছিল।
তবে শনিবার সেই সরবরাহ কমিয়ে ৫০ কোটি ঘনফুটে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে দেশের এলএনজি সরবরাহ সক্ষমতার তুলনায় বর্তমানে সরবরাহ প্রায় ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
পুরোনো টার্মিনাল নিয়ে প্রশ্ন
মহেশখালীর সাগরে অবস্থানরত এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনাল জাহাজটির নাম ‘এক্সিলেন্স’। এটি ২০০৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্মিত। সে হিসাবে জাহাজটির বয়স প্রায় ২১ বছর।
২০১৮ সালে দেশের প্রথম ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল হিসেবে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। চালুর পর থেকে অন্তত পাঁচবার বিভিন্ন কারণে টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুরোনো হওয়ায় টার্মিনালটিতে বারবার কারিগরি ত্রুটি দেখা দিচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এক্সিলারেট এনার্জির কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
টার্মিনালটি দ্রুত পুরোপুরি সচল না হলে দেশের আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন খাতে গ্যাস সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

